আগামীর সময়

শিক্ষার উন্নয়নযাত্রা: কাঙ্ক্ষিত সূচনার অপেক্ষায়

শিক্ষার উন্নয়নযাত্রা: কাঙ্ক্ষিত সূচনার অপেক্ষায়

কথায় আছে ‘উঠন্তি মুলো পত্তনে চেনা যায়’। অর্থাৎ সকালটা দেখে আন্দাজ করা যায় দিনটা কেমন যাবে। এই ভাবনা থেকে বাঙালিমাত্রই আশা করে— যে কোনো কাজের শুরুটা যেন ভালো হয়। বড় কাজের ভালো শুরুর জন্য তাই দোয়া-দরুদও করা হয়।

নতুন সরকারে ক্লিন ইমেজের অভিজ্ঞ শিক্ষামন্ত্রী পেয়ে সবাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। তার কথাবার্তায় শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তনের যে আশা জনমানসে জেগেছিল তা মিইয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনি। এই কদিনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা নিয়ে শিক্ষকসমাজে ব্যাপক কানাঘুষা চলছে। শিক্ষকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন ছিল।

৩৮ দিনের ছুটির মধ্যে হঠাৎ জানানো হলো প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫ সামনের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য ৮-১০ মার্চের মধ্যে ছাত্রী বাছাই করে অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর অনেকগুলো অসুবিধা আছে। গত বছরের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এ বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। আবার পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাস পড়লে ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ায় ব্যাঘাত ঘটবে। এতে শিখন ঘাটতি বাড়বে। এছাড়া যারা পঞ্চম শ্রেণির বই সংরক্ষণ করেনি তারা বিপাকে পড়বে।

এই সিদ্ধান্ত নিতে তড়িঘড়ির প্রয়োজন ছিল কী? ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালে না হলেও চলে যেত। সেটাই হত সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। ২০২৬ সাল থেকে আবার শুরু করা যেতে পারত। এক বছরে দুটি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠান ইতিহাসের অপ্রয়োজনীয় অংশ হয়েই থাকবে।

গত ১০ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের যোগ্যতায় অভিজ্ঞতা ১৫ বছর থেকে ১৮ বছরে উন্নীত করা হয়। সমালোচনা আছে— ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় প্রধান শিক্ষক নিলে হাসিনার আমলের শিক্ষকগণের নিয়ন্ত্রণে যাবে প্রতিষ্ঠানগুলো, তাই ১৮ বছর করা। তবুও কাজটি সহজে করা যেত যদি ইতোপূর্বে এনটিআরসিএ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১৫ বছরের অভিজ্ঞদের আবেদনপত্র গ্রহণ না করত।

অভিজ্ঞতার মেয়াদ তিন বছর বাড়ানোর ফলে পূর্বের আবেদনকারীদের অনেকেই আর আবেদনের সুযোগ পাবেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি দলীয় বিবেচনায় হয়েছে মর্মে শিক্ষকরা যে কানাঘুষা করছেন, সরকার তা মিথ্যা প্রমাণ না করলে সংহতি দুর্বল হবে বৈকি।

গত ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের এক সভায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি থাকার বাধ্যবাধকতা শিথিল করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সভায় সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়ার পক্ষেও নাকি মতামত এসেছে! এই খবর চাউর হলে শিক্ষক সমাজ সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনায় সরব হয়ে ওঠেন। শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিপ্রায়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী একদিকে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে চান আবার নিরক্ষর সভাপতি চান। এই দ্বৈত মনোভাবে কর্তাদের মেকি আবরণের আড়ালের আসল চেহারাটিই ফুটে ওঠেছে। সভাপতির যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অবশ্যই প্রধান শিক্ষকের সমান কিংবা বেশি হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃত অর্থে শিক্ষার মানোন্নয়ন চাইলে এখান থেকেই শুরু করতে হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সভাপতি নিয়োগে আপস করা ঠিক হবে না। এই বিষয়গুলোয় গত অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো জননন্দিত হয়েছিল। তাই সেগুলো শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে বহাল রাখা প্রয়োজন। এছাড়া বর্তমান শিক্ষাক্রম দ্রুত পরিবর্তনে কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। নতুন শিক্ষাক্রমে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় শুরুত্বারোপ, বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগীয় ও মনোপেশীজ শিখনকে মূল্যায়নের আওতায় আনা এবং দক্ষতা অর্জনকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করাই যেন লক্ষ্য হয়।

লেখক: শিক্ষক

    শেয়ার করুন: