ভোট তাহলে হচ্ছেই!

শেষ পর্যন্ত ভোট হচ্ছে। পুরো দেশ ভোট শুরুর অন্তিম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এই ভোট নিয়ে কী নেতিবাচক প্রচারণাটাই না ছিল! বলতে গেল- ভোট না হওয়ার কথাই বেশি শোনা যেত। ভোটের আলোচনা উঠলেই একপক্ষ দায়িত্ব নিয়ে গলা চড়িয়ে বলত- ভোট হবে না। ভোট হওয়ার পক্ষ যত যুক্তিই তোলা হতো না কেন, তা হালে পানি পেত না।
সাংবাদিকদের মধ্যেও সংশয় ছিল। যারা মার্কামারা তারা জোর গলায় বলেছে, ভোটের পরিবেশ নেই। এভাবে ভোট হতে পারেনা। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে ভোটের দিনও ভোট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ভোটের দিনই গঠন হতে পারে নতুন সরকার।
যারা ভোট চাচ্ছিল তারাও সংশয়াচ্ছন্ন ছিলেন। তাদের সংশয়ের কারণ- আস্থার অভাব। কারণ তারা সব সময়ই ফাঁকফোকর গলিয়ে অন্যের দুর্বলতার সুযোগে দেশ চালিয়েছেন।
আর এক প্রতিপক্ষ তো দুদিন পর পর ঢাকাই ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছে মিছিল সমাবেশ ডেকে।
পরিস্থিতি বুঝে অমলাও টুকুস করে প্রশ্ন ছুড়ে দিতেন, ‘এতো আস্থার সাথে কিভাবে বলছেন ভোট হবে? এতো এনার্জি কোথায় পান?
ব্যবসায়ীরা দুদিকেই তাল দিয়েছেন। ভোট হলেও তারা সরকারের দিকে, না হলেও তারা সরকারের দিকে। কারণ সরকার ছাড়া তাদের চলে না। কিন্তু তারাও শেষ পর্যন্ত ভোট হবে এই আশাই করেছেন।
আর ভোট হবে কি হবে না এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন রাজনীতিকরা। বিভিন্ন দলের পারস্পারিক আস্থা নেই। তাদের বিশ্বাসের অভাব ছিল। তাছাড়া পূর্বের নির্বাচন অভিজ্ঞতাও ভালো না। একারণেই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কখন ভোট হবে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
সরকার পইপই করে যতই বলার চেষ্টা করেছে ভোট হবে, ততই তা একপাশে সরিয়ে রেখেছেন সমালোচকরা। সাধারণ মানুষও আস্থা পায়নি। আর কে না জানে- এদেশে নেতিবাচক চিন্তাই বেশি ছড়ায়। আর সেজন্যই ভোটের শিডিউল ঘোষণার পরও তা ভোটের উত্তাপ ছড়াতে পারেনি।
কেমন পরিস্থিতি ঢাকার
ঢাকা ফাঁকা হয়ে গেছে। ভোটাররা তাদের স্বজনদের নিয়ে চলে গেছে নিজের ডেরায়। ঈদের সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয় ভোটে সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঢাকায় আজ বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে। ১০ মিনিটে পৌঁছানো যাচ্ছে ধানমন্ডি থেকে গুলশান। যাত্রীর তুলনায় যানবাহনও বেশ আছে। তাতে অপ্রত্যাশিত কম সময়ে গন্তব্য যাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকার মোড়ে মোড়ে যেটুকু জটলা আছে তা চলছে নিছকই ভোট গুলতানি। আকাশের বুক-চিরে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল বা বস্তির ঝুপড়ি ঘর, আধুনিক ছিমছাম কাফে বা গলির মাথার চায়ের টং দোকান। সবাই মশগুল ভোট নিয়ে। অনেক দিন পর ভোট হচ্ছে। মানুষও ভোট চেয়েছিল।
প্রশাসন কী নিয়ে প্রস্তুত
নির্বাচন কমিশন বলছে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে সব উপকরণ পৌঁছে গেছে।
প্রশাসন বলছে সবচে বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লাখো পুলিশ, আনসার, বিজিপি, সশস্ত্র বাহিনী শান্তিপূর্ণ ভোট পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। তারা বলছে ভোট কেন্দ্রে যেতে কোনো ভয় নেই।
এক দল বলছে ‘দেশকে ধর্ম-ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেবেন না’, ‘একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীদের বিশ্বাস করবেন না।’ আর এক দল বলছে, ‘সবাইকে দেখেছেন। তারা কিছুই দিতে পারেনি। আমাদের একটি বার সুযোগ দিন।’
ভোটের দুই প্রতিপক্ষ- এই কিছুদিন আগেও ছিল রাজনৈতিক মিত্র। এখন তাদের মধ্যে ভোট নিয়ে গরম আলোচনা, চলছে রেষারেষিও। গত ১৫ বছর যা দেখা যায়নি। বলা হয়-সেসময় সব কিছুই ছিল পূর্ব নির্ধারিত।
এই অবস্থায় ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে সাধারণ মানুষ। রাত পোহালেই ভোটের জন্য লাইন পড়ে যাবে। নাগরিকরা শুধু তাদের ভোটের অধিকারই ফিরে পাচ্ছেন না, এই ভোটে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে কিছু অবশ্যম্ভাবী সংস্কারেরও।
কিছু সংস্কার হয়তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হবে না। এই সংস্কারের জন্য হয়তো আরও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিন্তু তারপরও কিছু সংস্কারের আশা পূরণ হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক

