আগামীর সময়

‘প্রৌঢ় শিশু’ খেলে চলেছেন আনমনে

‘প্রৌঢ় শিশু’ খেলে চলেছেন আনমনে

সংগৃহীত ছবি

যা ইচ্ছা তাই করছেন। তুলে নিচ্ছেন ভিনদেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে। শুল্কযুদ্ধ চালাচ্ছেন একতরফা। কোনরকম উস্কানি ছাড়াই জ্বালানিবাহী জাহাজে বোমাবর্ষণ। যার প্রতিটা বিষয়ই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধাপরাধের নামান্তর। কিন্তু কে শুনে কার কথা। পুঞ্জ বা সংঘব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় ট্রাম্পকে কথা শোনায় এমন কেউ নেই। যারা তাকে কথা শোনাবে তারাও সুযোগসন্ধানী, অন্যকোথাও ওতপেতে রয়েছেন।


বহু রক্তপাতের পর গাজায় নামমাত্র যুদ্ধবিরতি। ভেতরের আগুন প্রশমিত হয়নি। ধারাবাহিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আশকারায় এ পরিস্থিতি। ইউক্রেনজুড়ে বারুদের গন্ধ। সুদান থেকে সিরিয়া। সর্বত্র উত্তেজনা, আগ্রাসন ও কূটনৈতিক দ্বৈততার জটিল চিত্র। ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটে নিকোলাস মাদুরোবিরোধী শক্তিকে প্রকাশ্য সমর্থন এবং পরিণতিতে মাদুরোকে তুলে আনা। তারই সর্বশেষ সংযোজন ইরান।


ইরান একা নয়; অঞ্চলে তার মিত্র ও প্রভাববলয় রয়েছে। ক্ষয়িষ্ঞু হলেও লেবানন ইয়েমেন পাশে দাঁড়াবে।


উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজার এখানে বড় ইস্যু। এখানকার অস্থিরতায় তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। যদিও ইরান হামলা চালিয়েছে আরব আমিরাত, সৌদি আরবের মতো মুসলিম দেশগুলোতেও। তারপরও মুসলিম বিশ্বের সমর্থন পাওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে প্রভাবশালী, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।


ফলে এই হামলা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তীব্র করতে পারে। যদিও ইরানের ভেতরে বিভিন্ন মতপার্থক্য প্রকট। এরপরও শীর্ষ নেতাকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় জাতীয়তাবাদী আবেগ তীব্র হতে পারে, যা কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন করে তুলবে। সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি আঞ্চলিক ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।


ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি নীরব সমর্থন দেখিয়েছে যাচ্ছে। কিন্তু যখন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প হুমকি দেন তখন ইউরোপিয় নেতাদের অস্বস্তি দেখা যায়। এতে স্পষ্ট হয়, বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিতে সমর্থন ও আপত্তির সীমারেখা স্বার্থনির্ভর এবং পরিবর্তনশীল। উত্তর আমেরিকায়ও সম্পর্ক সবসময় মসৃণ নয়। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে সময়ে সময়ে উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে। যদিও তা সাধারণত কূটনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই সমাধান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সম্পর্কটা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার চেয়েও উত্তাল।


যুক্তরাষ্ট্র একতরফা শুল্ক আরোপ করে পণ্যসরবরাহ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। তারা বিশ্ব বাণিজ্যের মাঠে আগে থেকেই প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ খেলে নিজেদের প্রস্তুত করে রেখেছিল ষোল আনা। আন্তর্জাতিক উদার সরবরাহ ব্যবস্থায় যাদের অগাধ আস্থা ছিল তারা ঘোর বিপদে পড়েছে। কিন্তু যাদের নিজেদের পর্যাপ্ত উৎপাদন নেই তারা দিশাহীন। অথচ বাণিজ্যব্যবস্থা বহু দশক ধরে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে। একটি দেশের কাঁচামাল, আরেক দেশের উৎপাদন, তৃতীয় দেশের বাজারÑএই আন্তঃসংযোগই আধুনিক অর্থনীতির শক্তি।


বাংলাদেশের পোশাকশিল্প তেমনই একটি ব্যবস্থার ফল। এদেশ থেকে পোশাক যায় ইউরোপে। কিন্তু সেই পোশাকের কাপড় বা কাপড়ের উপকরণ আনতে হয় ভিনদেশ থেকে। সস্তা শ্রমের কারণে এখানে পোশাকশিল্প গড়ে উঠলেও তা অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। কাঁচামাল উৎপাদনকারী, পণ্য উৎপাদন এবং পণ্য ভোগে এই তিন দেশের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি হয়। কিন্তু হঠাৎ শুল্ক বৃদ্ধি সেই সেতুবন্ধনে ফাটল ধরায়। যারা বিদেশি কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আবার যারা নির্দিষ্ট বাজারে রপ্তানির উপর নির্ভর করে, তারা শুল্কের চাপে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারায়।


বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা কাঠামোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা মুক্ত ও ন্যায্য বাণিজ্যের নীতি প্রতিষ্ঠার কথা বললেও, বাস্তবে বড় শক্তিগুলোর একতরফা সিদ্ধান্ত অনেক সময় সেই নীতিকে দুর্বল করে দেয়। এতে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের বিকল্প বাজার বা উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত।


এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় পড়েন, শিল্পখাত পরিকল্পনা বদলাতে বাধ্য হয়, আর ভোক্তারা উচ্চমূল্যের বোঝা বহন করেন। অর্থাৎ যারা বৈশ্বিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তুলেছিল, তারা হঠাৎ করেই দিশাহীন হয়ে পড়ে।


সব মিলিয়ে একতরফা শুল্কনীতি কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশলও। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নির্ভর করেÑবিশ্ব কি আবার সহযোগিতার পথে ফিরবে, নাকি বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।


সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতি আজ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে শক্তির ভাষা, কূটনীতির নীরবতা এবং স্বার্থের হিসাবÑএই তিনের সংঘাতে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ নির্ধারিত হচ্ছে।

সব অঘটনের নেপথ্যে যে ‘প্রৌঢ় শিশুটি’ একমনে কাজ করছেন তিনি হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিশুর খেলার মাশুল দিতে হয় পরিবারকে। এখানে প্রৌঢ় শিশুর খেলার মাশুল দিতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে। প্রশ্ন হচ্চে কতটা আধাঁর সইতে পারবে এই বিশ্ব। অতিবড় আশাবাদীও টের পাচ্ছেন সামনের দিনগুলো ‘ এ বড়ো সুখের সময় নয়’।


লেখক: সাংবাদিক

    শেয়ার করুন: