নৃশংস গৃহযুদ্ধের সূচনাকারী সাবেক জেনারেলই হচ্ছেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি

ছবিঃ রয়টার্স
মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারে অং সান সূচির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ও নৃশংস গৃহযুদ্ধ শুরুর নায়ক জেনারেল মিন অং লাইং। নবনির্বাচিত সংসদ আজ তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেবে। এই পদে বসার জন্য সংবিধান অনুযায়ী ইতোমধ্যেই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এক-চতুর্থাংশ আসন এবং নির্বাচনের আগে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব দল ইউএসডিপি তাদের পক্ষে তৈরি করা পরিবেশে অবশিষ্ট আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ জিতে নেওয়ায় ফলাফল মূলত পূর্বনির্ধারিত ছিল। নতুন সরকার গঠিত হলে তাতেও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে মিন অং লাইং-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং একইসাথে কঠোর পন্থী এবং নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন উ'র স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খোদ নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তিনি নতুন একটি পরামর্শদাতা পরিষদও গঠন করেছেন। এই পরিষদের কাছে বেসামরিক ও সামরিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে। এক কথায় বলা যায়, সামরিক পোশাক খুললেও ক্ষমতা যেন না কমে সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন মিন অং লাইং।
কিয়াও উইনের (ছদ্মনাম) মতো তরুণ আন্দোলনকর্মীদের জন্য পরিবর্তনের সব আশা শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রাবস্থায় ২০২২ সালের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জেলে পাঠানোর আগে এক সপ্তাহ ধরে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। সম্প্রতি তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
কিয়াও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তারা লোহার রড দিয়ে আমার পিঠে মেরেছে। সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে, ছুরি দিয়ে আমার উরুতে আঘাত করেছে। তারপর তারা আমার অন্তর্বাস খুলে নিয়ে আমাকে যৌন নির্যাতন করেছে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, কিন্তু তারা যে আমার কাছ থেকে কী শুনতে চায় তা কখনোই স্পষ্ট ছিল না’— বলছিলেন তিনি।
কিয়াও উইনের ভাষায় বিপ্লবের প্রতি তার অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারের ভেতর থেকে এখন তিনি খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না। তিনি দেশের বাইরে কাজ খোঁজার কথা ভাবছেন। মিন অং লাইংয়ের অভ্যুত্থানের পর থেকে গত পাঁচ বছর মিয়ানমারের জন্য বিপর্যয়কর ছিল।
২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে অং সান সুচি এবং তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংসদ যখন তাদের আরও এক মেয়াদের জন্য অনুমোদন দিতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষমতা দখল করা হলে জনরোষ উসকে দেওয়ার হিসাবটি তিনি মারাত্মকভাবে ভুল কষেছিলেন। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে তার প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহযুদ্ধের সূচনা করে, যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বাস্তুচ্যুত করেছে লাখ লাখ মানুষকে, আর ধ্বংস করে দিয়েছে দেশটির অর্থনীতিকে।
সামরিক শাসন দেশের বিশাল এলাকা সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে ছেড়ে দিয়েছে। এর জবাবে তারা বিরোধীপক্ষের নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলোতে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা ধ্বংস করে দিয়েছে স্কুল, বাড়িঘর এবং হাসপাতাল। এটি মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের এক সামরিক কৌশল, যা ‘চার আঘাত’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনকারী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেওয়া। চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক জান্তা বর্তমানে গত দুই বছরে হারানো কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।

