মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা: গ্যাস-তেলের দামে উল্লম্ফন
- বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা
- জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় শঙ্কা যুক্তরাজ্য-ইউরোপে

এইআই নির্মিত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে কাতার ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে সাম্প্রতিক সামরিক হামলার জেরে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে যুক্তরাজ্যে পাইকারি গ্যাসের দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি থার্ম ১৭৪ পেন্সে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমে সকাল ৮টা (জিএমটি) নাগাদ ১৬৯ পেন্সে নেমে আসে। গত তিন বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ দাম। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে, যখন ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে, তখন প্রতি থার্মের দাম ছিল ৭১ দশমিক ১৩ পেন্স। সে হিসাবে দাম বেড়েছে প্রায় ১৪০ শতাংশ।
ইউরোপেও একই চিত্র। গ্যাসের বেঞ্চমার্ক মূল্য ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা প্রায় ৭৪ ইউরোতে উঠেছে, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে রয়েছে কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কমপ্লেক্সে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস রপ্তানি কেন্দ্রটিতে ‘ব্যাপক ক্ষতি’ ও ‘বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের’ কথা জানিয়েছে কাতার কর্তৃপক্ষ। কবে নাগাদ উৎপাদন স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এর আগে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল হামলা চালায় বলে খবর প্রকাশিত হয়। ইরান-কাতার যৌথভাবে পরিচালিত এই ক্ষেত্রটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসভাণ্ডারের অংশ। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু স্থাপনাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা দেশের পূর্বাঞ্চল ও রাজধানী রিয়াদে হামলা প্রতিহত করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জ্বালানি বিশ্লেষকেরা। ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টন ল’ সেন্টারের সুসান সাকমার বলছিলেন, ‘এটি হঠাৎ করেই বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি করেছে। কাতার কবে উৎপাদন আবার শুরু করতে পারবে, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত নেই।’
‘এটি এলএনজি শিল্পের জন্য বড় ধরনের মোড় ঘোরানো ঘটনা হতে পারে—নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে হামলার মতো, এমনকি তার চেয়েও বেশি—যোগ করেন এই জ্বালানি বিশ্লেষক।
এদিকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৭ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৪ থেকে ১১৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সংঘাতের শুরুর সময়কার উচ্চতার কাছাকাছি।
সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের পার্লামেন্টে এই পথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে জাহাজে হামলার হুমকিতে ইতোমধ্যে নৌযান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।
দেশীয় উৎপাদন থাকলেও যুক্তরাজ্য এখনো আমদানি করা গ্যাসের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বিশেষ করে উত্তর সাগর থেকে সীমিত সরবরাহের পাশাপাশি নরওয়ে ও অন্যান্য ইউরোপীয় উৎস থেকে গ্যাস আমদানি করা হয়। চলতি শীতে তাপমাত্রা কম থাকায় ইউরোপের গ্যাস মজুতও স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের মোট জ্বালানি সরবরাহের ৩৩ শতাংশই ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়তে থাকায় এই অনুপাত কিছুটা কমে আসছে।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রিস ব্রায়ান্ট বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ‘গালফ অঞ্চলে যা ঘটছে, সেখান থেকে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো আমাদের তেল ও গ্যাসের দামের ওপর এতটা নির্ভরশীল থাকা চলবে না।’
‘দশ বছর পর মানুষ বলবে, এটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল এবং লেবার সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল’— যোগ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রিস ব্রায়ান্ট।
চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার তথা অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস জ্বালানি শুল্কসীমা (ফুয়েল ডিউটি ক্যাপ) নিয়ে করণীয় বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন বলে দাবি করেন দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়বে। এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জেস রালস্টন মনে করেন, ‘এটি গ্রাহকদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেকেই এখনো ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার গ্যাস সংকটের দেনা বহন করছেন।’
রালস্টনের মতে— ‘নর্থ সি থেকে আরও বেশি গ্যাস উত্তোলন করলেও ভোক্তাদের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না, কারণ দাম নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক বাজারে। সহজভাবে বললে, এ ধরনের ধাক্কা থেকে বাঁচতে হলে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে হবে।’ তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও হিট পাম্পের মতো প্রযুক্তির ওপর জোর দেন।
বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে গ্যাসের ভূমিকা বাদ দেওয়া গেলে যুক্তরাজ্যের পরিবারগুলো বছরে প্রায় ২০০ পাউন্ড পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে— উল্লেখ করা হয়েছে কমনওয়েলথ থিংকট্যাংকের এক প্রতিবেদনে।
ইউরোপের দেশগুলোর সরকার এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথ খুঁজছে। পোল্যান্ড ও ইতালির মতো কিছু দেশ ভোক্তাদের চাপ কমাতে কার্বন কর কমানোর পক্ষে মত দিয়েছে। তবে জার্মানি ও স্পেনের মতো দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে এ প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে কিছু জানত না। তবে তিনি তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, কাতার বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য জ্বালানি স্থাপনায় আর কোনো হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘সাউথ পার্সের পুরো স্থাপনাই ধ্বংস করে দেবে।’
এর জবাবে ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা হলে প্রতিপক্ষ ও তাদের মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালানো হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ বাড়ছে। ফলে আগামী সপ্তাহগুলোতে এই জ্বালানি সংকটই ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে— মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

