আগামীর সময়

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে যুক্তরাজ্য

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে যুক্তরাজ্য

সংগৃহীত ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বড় উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) বলছে, জ্বালানির উচ্চ মূল্য দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, প্রবৃদ্ধি কমাবে এবং পরিবারের ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে প্যারিসভিত্তিক ওইসিডি ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ০ দশমিক ৭ শতাংশে নামিয়েছে। আগে তাদের পূর্বাভাস ছিল ১ দশমিক ২ শতাংশ। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় নিম্নমুখী সংশোধন। এতে চলতি বছরে উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর একটিতে পরিণত হতে যাচ্ছে ব্রিটেন।

ওইসিডি বলছে, জি–২০ দেশগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খাবে যুক্তরাজ্য। কারণ, দেশটি আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে গ্যাসের দামের ওঠানামার প্রতি খুবই সংবেদনশীল। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হাইড্রোকার্বন রপ্তানি করায় এ বছর তুলনামূলক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরো অঞ্চল ও দক্ষিণ কোরিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তবে যুক্তরাজ্যের মতো নয়।

সংস্থাটি জানিয়েছে, অপরিশোধিত তেল, জেট জ্বালানি, ডিজেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হচ্ছে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়বে, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে।

ওইসিডি বলছে, ‘সংঘাতের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির উচ্চ মূল্য বজায় থাকলে তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে, ভোক্তা মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে এবং এর ফলে প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

সংস্থাটি আরও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্ক বাড়ানোও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জন্য আরেকটি ঝুঁকি। ওইসিডির ভাষ্য, ‘পূর্বাভাসের জন্য একটি বড় নিম্নমুখী ঝুঁকি হলো, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে জ্বালানির দাম ধারণার চেয়েও বেশি বাড়তে পারে, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ঘাটতি তীব্র হতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।’

তারা আরও উল্লেখ করেছে, ‘এমন পরিস্থিতি, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশার তুলনায় কম মুনাফা এলে, আর্থিক বাজারে আরও বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়ন শুরু হতে পারে, যা চাহিদা দুর্বল করবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়াবে।’

ওইসিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ শতাংশে উঠবে। বর্তমানে তা ৩ শতাংশ, গত বছর ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এতে জি–৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি হবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, শুধু যুক্তরাষ্ট্র এর ওপরে থাকবে।

দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও বাড়তি মূল্যস্ফীতি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। আর্থিক বাজারে এ বছর অন্তত দুই দফা সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা ধরা হচ্ছে। তবে ওইসিডির ধারণা, শ্রমবাজার দুর্বল থাকায় বর্তমান ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ নীতিসুদই যথেষ্ট কঠোর। তাই এ বছর সুদহার অপরিবর্তিত থাকবে, পরে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে তা ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমানো হতে পারে। তাদের মতে, আগামী বছর যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নামবে, যদিও সেটি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ২ শতাংশ লক্ষ্যের ওপরে থাকবে। একই সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে ১ দশমিক ৩ শতাংশে।

এই পূর্বাভাস ব্রিটেনের অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির (ওবিআর) হিসাবের চেয়েও দুর্বল। ওবিআর চলতি মাসের শুরুতে এ বছর ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং আগামী বছর ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে সেই হিসাব করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার আগে।

ওইসিডি বলছে, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। যদি মূল্যচাপ আরও বিস্তৃত হয় বা প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়, তবে মুদ্রানীতিতে সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।’

বছরের শুরুতে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কিন্তু জ্বালানির দামের নতুন উল্লম্ফনে সুদহার কমার আশা ও মূল্যস্ফীতি শিথিল হওয়ার প্রত্যাশা ধাক্কা খেয়েছে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ডেপুটি গভর্নর সারা ব্রিডেন বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘তেল ও গ্যাসের দাম আর ব্যাংক রেটের সম্ভাব্য গতিপথের মধ্যে সরাসরি একটি সরলরেখা টানা যায় না।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘২০২২ সালের সর্বশেষ জ্বালানি ধাক্কার সময়ের তুলনায় এখনকার অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন।’

তার ভাষায়, এবার সংকট এমন সময়ে এসেছে, যখন মূল্যস্ফীতি আবার ২ শতাংশের দিকে ফিরছিল, শ্রমবাজার দুর্বল হচ্ছিল এবং প্রবৃদ্ধি ছিল ‘ল্যাকলাস্টার’ বা নিতান্তই ম্লান। তার মতে, এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং শ্রমিকদের জন্য বেশি মজুরি আদায় করা কঠিন হবে। ফলে স্থায়ী মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কিছুটা সীমিত থাকবে। তবে তিনি বলেছেন, জ্বালানির দামের প্রতি যুক্তরাজ্যের সংবেদনশীলতার কারণে বাজারের প্রত্যাশা বদলানো ‘অস্বাভাবিক নয়’, কিন্তু ‘ঝুঁকি দুই দিকেই রয়েছে’।

সংকটের কারণে শীতের আগে পরিবারগুলোকে জ্বালানি বিলের চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে ট্রেজারির ওপর চাপ বাড়ছে। তবে ওইসিডি সতর্ক করেছে, সবার জন্য সমান সহায়তা দিলে চাপে থাকা সরকারি অর্থব্যবস্থা আরও কঠিন হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের মতে, সহায়তা হতে হবে ‘সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পরিবার ও টেকসই সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট’, জ্বালানি ব্যবহার কমানোর প্রণোদনা বজায় রাখতে হবে এবং ‘স্পষ্ট মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যবস্থাও’ থাকতে হবে।

চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার র‍্যাচেল রিভস ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, ২০২২ সালে লিজ ট্রাস সরকারের মতো সর্বজনীন সহায়তার পথে এবার হাঁটা হবে না। জ্বালানি ব্যয়ে যেকোনো সহায়তা হবে লক্ষ্যভিত্তিক।

ওইসিডির প্রতিবেদন নিয়ে রিভস উল্লেখ করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি, আর এই যুদ্ধে আমরা যোগও দিইনি। কিন্তু এই যুদ্ধ আমাদের দেশের ওপর প্রভাব ফেলবে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনিশ্চিত এই বিশ্বে আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই সঠিক। আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছি, তা দেশের আর্থিক অবস্থা এবং পরিবারের আর্থিক সুরক্ষাকে বৈশ্বিক অস্থিরতা থেকে রক্ষার জন্য আমাদের আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’

রিভসের ভাষায়, ‘আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মানে হলো আরও এগিয়ে গিয়ে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ অর্থনীতি গড়ে তোলা। আর সে জন্য আমাদের তিনটি বড় সিদ্ধান্তে আরও এগোতে হবে। সেগুলো হলো আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনকে গ্রহণ করা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা।’

পারস্য উপসাগরে সামরিক তৎপরতা শুরুর পর কোনো বড় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের এটিই প্রথম বড় হালনাগাদ মূল্যায়ন। ওইসিডির এই বার্তা স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত ব্রিটেন সবচেয়ে বেশি টের পাবে ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং পরিবারের ব্যয়ের বাড়তি চাপের মাধ্যমে।

    শেয়ার করুন: