আগামীর সময়

প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প ভাবনা যুক্তরাজ্যের

প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প ভাবনা যুক্তরাজ্যের

সংগৃহীত ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থানকে সামনে রেখে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কানাডার মতো ‘মধ্যম শক্তিধর’ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা।

শুক্রবার প্রকাশিত পার্লামেন্টের জয়েন্ট কমিটি অন দ্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি (জেসিএনএসএস)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’র জন্য সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে, যেখানে কোনো সংকটে ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারবে না।

বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাইডেন্ট পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আউকাস সাবমেরিন চুক্তির মতো বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্প।

তবে জ্যেষ্ঠ এমপি ও লর্ডদের নিয়ে গঠিত জেসিএনএসএস বলেছে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এমন কিছু ‘স্পষ্ট টানাপোড়েনের ক্ষেত্র’ সামনে এসেছে, যা ‘এই নির্ভরতাগুলোর নির্ভরযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে’।

ডেনমার্কের স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের হুমকি ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। এমনকি আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিকের দ্বীপটিতে হামলা চালাতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে ডেনিশ সেনারা গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের রানওয়ে উড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল বলেও খবর আসে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতিক্রিয়া নিয়েও ট্রাম্প বারবার সমালোচনা করেছেন। তিনি স্টারমারকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, তিনি ‘আমরা যুদ্ধ জিতে যাওয়ার পর সেখানে যোগ দিতে চান’; এমনকি তিনি ‘উইনস্টন চার্চিল নন’ বলেও মন্তব্য করেছেন।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তথাকথিত বিশেষ সম্পর্ক ‘আগের মতো নেই’। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মরিশাসের কাছে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের চুক্তি নিয়েও ট্রাম্প বারবার সমালোচনা করেছেন। শুরুতে সমর্থন দিলেও পরে এ নিয়ে তিনি একাধিকবার অবস্থান বদলেছেন।

জেসিএনএসএসের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের উচিত আরও ইউরোপ-নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে সরে আসা, যা অপর পক্ষের ওপর এতটা নির্ভরশীল’।

প্রতিবেদনে আরও সুপারিশ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার চাপে পড়া এড়াতে যুক্তরাজ্যের উচিত ‘কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর’ সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।

জেসিএনএসএসের চেয়ারম্যান এবং লেবার পার্টির এমপি ম্যাট ওয়েস্টার্ন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।'

‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুক্তরাজ্যের গভীর নির্ভরতার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, এবং প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টরা বদলালেও এই অংশীদারত্ব টিকে থাকবে', বলেছেন তিনি।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘কিন্তু যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কৌশলগত নির্ভরতার কিছু ক্ষেত্র থেকে সরে আসার জন্য একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার।’

এর আগে চলতি বছরের আরেকটি প্রতিবেদনে সাবেক জ্যেষ্ঠ ন্যাটো উপদেষ্টা ক্রিস ডনেলি এবং এমপি বার্নার্ড জেনকিন ও ডেরেক টুইগ বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এবং এ বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে, তারা আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করতে পারবে না।

সিভিটাস থিংকট্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমাদের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে; অর্থাৎ আমাদের এমন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর নির্ভরযোগ্য মিত্র থাকবে না এবং সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থকে অনুসরণ করে আলাদা এক পক্ষ হয়ে উঠতে পারে।’

জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, ‘পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসছে না।’

বেশ আলোচিত সেই ভাষণে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে, কারণ আমরা যদি টেবিলে না থাকি, তাহলে আমরা মেন্যুতে পরিণত হব।’

শুক্রবার প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা পর্যালোচনায় এমপি ও লর্ডরা জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়ে ‘আরও বেশি স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা চীনকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণকারী ‘চায়না অডিট’-এর একটি সংস্করণ প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন।

সরকারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা হুমকি বাড়ছে এবং তীব্র হচ্ছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবাদ ও জৈবনিরাপত্তা–সংক্রান্ত হুমকিও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়াই যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় একক হুমকি; পাশাপাশি চীন ও ইরানও ‘কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ তৈরি করছে।

জেসিএনএসএস বলছে, চীন যে ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকা জনআস্থাকে ক্ষয় করতে পারে। তারা আরও সতর্ক করেছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তায় ব্যয় কমানোয় বিশেষ করে আফ্রিকায় এমন এক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, যা রাশিয়া ও চীন কাজে লাগাচ্ছে।

এক সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা আমাদের প্রথম দায়িত্ব। দেশকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের অবস্থান আরও শক্ত ও ধারালো করতে আমরা এক মুহূর্তও নষ্ট করিনি; শীতল যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় স্থায়ী প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ আমরা দিচ্ছি।

তিনি বলছেন, ‘ন্যাটো ও ফাইভ আইজের শীর্ষ সদস্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে মিত্রদের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা এই সব প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করেছে।’

‘চীন বিষয়ে আমাদের অবস্থান একই আছে। যেখানে সম্ভব আমরা সহযোগিতা করব, আর যেখানে প্রয়োজন সেখানে চ্যালেঞ্জ জানাব। এর অর্থ হলো, চীন থেকে আসা হুমকির মোকাবিলা করা, আবার সে দেশ থেকে তৈরি হওয়া সুযোগও অনুসরণ করা এবং সর্বোচ্চ কাজে লাগানো’, উল্লেখ করেন তিনি।

    শেয়ার করুন: