আগামীর সময়

ইরান সংঘাতের প্রভাবে যুক্তরাজ্যে ওষুধ সরবরাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ইরান সংঘাতের প্রভাবে যুক্তরাজ্যে ওষুধ সরবরাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

সংগৃহীত ছবি

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাজ্যে ব্যথানাশক থেকে ক্যানসারের ওষুধ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ওষুধের দামও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই সংঘাত ইতিমধ্যে তেল, গ্যাস, ফসলের সার ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। পরবর্তী ধাক্কা আসতে পারে স্বাস্থ্যসেবা–সম্পর্কিত জরুরি উপকরণে।

বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান মুডিসের টেক্সাসভিত্তিক সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড উইকস বলেছেন, ‘এটা যেন ঝড়ের মধ্যে নিখুঁত ঝড়। উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংঘাতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে, আর ভারতকে বলা হয় বিশ্বের ফার্মেসি। তারা বিপুল পরিমাণ জেনেরিক [পেটেন্টমুক্ত] ওষুধ এবং এপিআই [অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস] উৎপাদন করে। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেগুলো বাইরে পাঠানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

দুবাই, দোহা ও আবুধাবির বিমানবন্দরগুলো প্রথমে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; এখন সীমিত সূচিতে পরিচালিত হচ্ছে। এতে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে তাদের চালান আকাশপথে ঘুরিয়ে পাঠাতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করছে, ফলে পণ্য পৌঁছাতে সময় বেশি লাগছে। অধিকাংশ ওষুধ পরিবহনের প্রধান পথ সমুদ্রপথ, যা এখন অধিকাংশই চাপে রয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ।

মেডিসিনস ইউকের প্রধান নির্বাহী মার্ক স্যামুয়েলসের মতে, ‘আমরা এখনো সংকটে পড়িনি, কিন্তু পরিস্থিতি গুরুতর।’ তিনি জানান, সংঘাত দীর্ঘ হলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওষুধের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

ওষুধ পরিবেশকরা সাধারণত ঘাটতি এড়াতে ছয় থেকে আট সপ্তাহের মজুত রাখে। আর যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোর সরবরাহকারীদের আট সপ্তাহের মজুত রাখা বাধ্যতামূলক।

কোভিড মহামারির সময় ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা চাহিদা সামলাতে হিমশিম খাওয়ায় ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে প্যারাসিটামল ও অন্যান্য ব্যথানাশকের সংকট দেখা দিয়েছিল। বিশ্বে ব্যবহৃত জেনেরিক ওষুধের ৬০ শতাংশই ভারত উৎপাদন করে; যুক্তরাষ্ট্রের মোট চাহিদার অর্ধেকও তারা জোগান দেয়।

যুক্তরাজ্য তাদের মোট ওষুধের প্রায় অর্ধেক নিজ দেশে উৎপাদন করে। এক–তৃতীয়াংশ আসে ভারত থেকে, আর বাকি একটি অংশ আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে আকাশপথে মাল পরিবহনের খরচও দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

স্যামুয়েলস বললেন, ‘এনএইচএসে (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) ব্যবহৃত প্রতি পাঁচটি ওষুধের একটি আকাশপথে আসে, আর এখন নির্মাতারা সেই বাড়তি খরচ নিজেরাই বহনের চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের মুনাফার হার ঐতিহাসিকভাবেই কম, ফলে ঝুঁকি হচ্ছে, কিছু ওষুধ এনএইচএসে সরবরাহ করাই লোকসানের হয়ে যেতে পারে।’

এনএইচএস হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সরবরাহকারীদের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি থাকলেও জিপি চেম্বার ও ফার্মেসিতে সরবরাহ করা ওষুধের ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা স্বাধীনতা আছে। সে ক্ষেত্রে দাম বাড়তে পারে।

অ্যান্টওয়ার্প ম্যানেজমেন্ট স্কুলের অধ্যাপক ও ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ ভাউটার ডেউলফের মতে, আপাতত ওষুধের সরবরাহ ‘বন্ধ হয়নি, তবে ব্যাহত হয়েছে’।

তিনি জানান, সংকট আরও বাড়লে ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা অতিরিক্ত খরচের চাপ এক অঙ্কের হারে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। তিনি যোগ করেন, ‘সবকিছু নির্ভর করছে যুদ্ধটা কত দিন স্থায়ী হয় তার ওপর।’

স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যাল সরবরাহব্যবস্থা–কৌশলবিদ এবং অলাভজনক সংস্থা ফার্মা.এরোর মহাসচিব ফ্রাঙ্ক ভ্যান গেল্ডার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ করিডোরে বিঘ্নের কারণে ওষুধশিল্প বড় ধাক্কা খেয়েছে, কারণ খাতটি ঘন ঘন ফ্লাইটের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল।

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার ৭০০টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট, যেগুলো কার্গোও বহন করে, এই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে যাতায়াত করত। তিনি বললেন, চলতি মাসের শুরুর দিকে এয়ার কার্গোর পরিমাণ ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছিল এবং এখনো তা অনেক নিচে রয়েছে।

কিছু ওষুধ দ্রুততা ও সংরক্ষণ–সংক্রান্ত কারণে অবশ্যই আকাশপথে পরিবহন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসার ও সংক্রামক রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসা, উচ্চপ্রযুক্তির সেল ও জিন থেরাপি, শীতল তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য জীবন্ত উপাদানসমৃদ্ধ বায়োলজিকস এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যবহৃত ওষুধ।

ডেউলফ জানান, স্থিতিশীল জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে সমুদ্রপথ বিকল্প হতে পারে, কিন্তু জাহাজগুলোকে এখন উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে যাত্রাপথে আরও ১৪ দিন সময় লাগছে এবং জ্বালানিতে অতিরিক্ত ১০ লাখ ডলার বা সাত লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড খরচ হচ্ছে।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বাইরে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিথানল ও ইথিলিনের মতো পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দামও বাড়ছে। এসব উপাদান ওষুধের প্রধান কার্যকর উপাদান এপিআই তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি সিরিঞ্জ, ভায়াল, টিউবিং, গাউন ও গগলস তৈরিতেও এগুলোর প্রয়োজন হয়।

ফ্রাঙ্ক ভ্যান গেল্ডারের ভাষ্য, ‘সামগ্রিকভাবে শিল্পখাতে, আর এই ক্ষেত্রে লাইফ সায়েন্স ও ফার্মা শিল্পে এর ঢেউখেলানো প্রভাব অত্যন্ত বড়।’ এরপর তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এর খরচ দেবে কে?’

তার ভাষায়, শেষ পর্যন্ত এই বোঝা বহন করতে হবে রোগীকেই, সরাসরি বা এনএইচএসের মতো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের অর্থেই পরিচালিত হয়।

 ‘তাহলে শেষ পর্যন্ত তো আমরা সবাই বেশি দামই দিচ্ছি, তাই না?’, প্রশ্ন রাখেন তিনি।

    শেয়ার করুন: