আগামীর সময়

ইরানযুদ্ধের বিরোধিতা করলেই ট্রাম্পের খড়্গ

ইরানযুদ্ধের বিরোধিতা করলেই ট্রাম্পের খড়্গ

ডোনাল্ড ট্রাম্প

পরমাণু নিয়ে আলোচনার মধ্যে শনিবার ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। নিহত হন খামেনির পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও।

প্রথম দিন হামলা চালানোর পর ইরানকে সহজেই কুপোকাত করতে পারবেন— এমন আশা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। কিন্তু ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে লাগাতার হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি পাল্টেে দেয়। অকেজো হয়ে পড়ে এসব ঘাঁটি।

তখন তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাতে এই অঞ্চলের আশপাশে থাকা মিত্রদের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে ওয়াশিংটনের। এজন্য ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন।

তবে সময়মতো যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়নি দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য। এতে বেজায় চটেছেন ট্রাম্প। পরে যদিও যুক্তরাজ্য বেকায়দায় পড়ে শর্ত জুড়ে দিয়ে ওয়াশিংটনকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু ততক্ষণে ট্রাম্প তার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন।

অনুমতি দিয়ে রবিবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে। তবে তিনি এ ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য একটি শর্ত দিয়েছেন। শর্ত হিসেবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ঘাঁটি ব্যবহার করা যাবে, তবে এসব অভিযান কেবল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হতে হবে।

তবে অনুমতি পেয়েও মন গলেনি ট্রাম্পের। প্রকাশ্যে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নিন্দা করেছেন। তাকে জর্জরিত করেছেন বাক্যবাণে। বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য শুরুতে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। আবার মন পরিবর্তন করে অনুমতি দিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ‘অত্যন্ত বেশি সময়’ নিয়েছেন।

ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি নিয়ে বলেছেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্ভবত এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। মনে হচ্ছে তিনি বৈধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

এরপর ট্রাম্প জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে ‘বন্ধুত্ব’ আর আগের মতো নেই। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য সানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আর আগের মতো শক্ত নেই।

অর্থাৎ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে নাজেহাল করে ছেড়েছেন ট্রাম্প।

শুধু যুক্তরাজ্য নয়, ইরান যুদ্ধে যে দেশই তার বিরোধিতা করছে বা ডাকে সাড়া দিচ্ছে না তাদের ওপরই ট্রাম্পের খড়্গ নেমে আসছে। যার সর্বশেষ নজির স্পেন।

দেশটির ঘাঁটি ব্যবহার করতে অনুমতি চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মাদ্রিদ ওয়াশিংটনকে ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। এর কারণে রোটা ও মোরন সামরিক ঘাঁটি থেকে ১৫টি বিমান সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।

এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম এ প্রেসিডেন্ট মাদ্রিদের ওপর একপ্রকার কথার ঝড় বইয়ে দিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানে হামলা করা মার্কিন এ রাজনীতিবিদ।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, স্পেন ভয়াবহ আচরণ করেছে। তিনি অর্থসচিব স্কট বেসেন্টকে স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।

ট্রাম্প খুবই জোর দিয়ে বলেন, আমরা স্পেনের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধ করে দেব। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে। আর দেশটি থেকে আমদানি করা হয় প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রে স্পেনের শীর্ষ রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওষুধ এবং জলপাই তেল।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যদি স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়, তাহলে দুই পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ ২০২৫ সালে হওয়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের তথ্যে প্রমাণ করে তারা একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটেরও (ন্যাটো) সদস্য স্পেন।

তবে এই আর্থিক ক্ষতি বা ন্যাটো নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন স্পেনের নেতারা। স্পেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী মারিয়া জেসুস মনতেরো বলেছেন, আমরা নিশ্চিতভাবেই কারও অনুগত ভৃত্য হচ্ছি না। আমরা কোনো ধরনের হুমকি সহ্য করব না এবং আমরা আমাদের মূল্যবোধ রক্ষা করব।

স্প্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেসও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি এবং জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী এই হামলা সমর্থন করা স্পেনের পক্ষে সম্ভব নয়।

আর দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সোজা যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইয়ে যুক্ত হবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। বুধবার সকালে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার সরকারের যে অবস্থান তাকে সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি শব্দেই বলা যায়, আর তা হলো যুদ্ধকে না।

এর কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে সানচেজ ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোকে ‘অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি’ না করার আহ্বান জানান।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইরাকে অভিযানে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। উল্টো নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি অনেক মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে।

এদিকে এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো তার পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। আগে যদিও তিনি ইরানে হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেছিলেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগে দ্রুতই তিনি মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

কার্নি বুধবার অস্ট্রেলিয়ায় তার সঙ্গে ভ্রমণকারী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইরানে হামলার বিষয়ে আমাদের আগে থেকে জানানো হয়নি। এতে আমাদের অংশ নিতেও বলা হয়নি।

এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হয় কার্নির। সেই কথাই তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন সেদিন। তবে তার সেই অবস্থানে তিনি বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি।

আজ বৃহস্পতিবার ক্যানবেরায় কার্নি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধে তার দেশের সামরিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দিতে পারেন না।

এর কারণ হিসেবে তিনি মিত্রদের পাশে থাকার কথা উল্লেখ করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তিনি মিত্রদের পাশে থাকবেন এবং সর্বদা কানাডিয়ানদের রক্ষা করবেন।

    শেয়ার করুন: