আগামীর সময়

লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

জ্বালানি খাতে ধাক্কা : এক রাতেই এলএনজি সংকটে পাকিস্তান

জ্বালানি খাতে ধাক্কা : এক রাতেই এলএনজি সংকটে পাকিস্তান

সংগৃহীত ছবি

চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। টানা তিন বছর ধরে এলএনজির চাহিদা কমছিল। ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৮২ লাখ টন থেকে কমে ২০২৫ সালের শেষের দিকে দাঁড়ায় ৬১ লাখ টনে। সস্তা সোলার প্যানেলের ব্যাপক বিস্তার এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাওয়াই ছিল এর প্রধান কারণ।

চাহিদা কমে যাওয়ায় সরকার অতিরিক্ত এলএনজি অন্য দেশে বিক্রি করে দেয়। একইসঙ্গে পাইপলাইনে অতিরিক্ত চাপ এড়াতে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমিয়ে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে লোকসান গুনে গ্যাস সরাসরি গৃহস্থালির নেটওয়ার্কে সরবরাহ করা হয়। এতে জ্বালানি খাতে বিদ্যমান বিপুল ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেয়।

তারপর পরিস্থিতি পাল্টে দিল যুদ্ধ। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক অবকাঠামো ও নেতৃত্ব লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন।

এর জবাবে ইরান পুরো অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।

এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ২ মার্চ ইরানের ড্রোন কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির গ্যাস স্থাপনায় আঘাত হানে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি কমপ্লেক্স।

যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার সব উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং ‘ফোর্স মাজেউর’ ঘোষণা করে। এটি একটি আইনি শব্দ, যার অর্থ তারা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের পরিস্থিতিতে সরবরাহ বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

পরবর্তীতে ১৮ মার্চ ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়, যা বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র। এটি কাতারের নর্থ ফিল্ডের সঙ্গে একই ভূগর্ভস্থ উৎসে অবস্থিত হওয়ায় উভয় দেশের গ্যাস উৎপাদনই ঝুঁকিতে পড়ে। পাল্টা হামলায় ইরান আবারও কাতারের স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে। কাতারএনার্জি জানায়, এতে এলএনজি উৎপাদন ১৭ শতাংশ কমতে বাধ্য হয়েছে। এটি মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপে গ্যাসের দাম একদিনেই ৬ শতাংশ বেড়েছে।

পাকিস্তানের জন্য এই পরিবর্তন ছিল একেবারেই আকস্মিক। দেশটি তাদের আমদানিকৃত গ্যাসের প্রায় পুরোটা কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সংগ্রহ করে। তাদের কোনো জরুরি মজুতও নেই। ফলে উদ্বৃত্ত থেকে সংকটে রূপান্তর ঘটে প্রায় এক রাতের মধ্যেই।

পাকিস্তান তাদের প্রতিদিনের গ্যাসের চাহিদা পূরণ করে তিনটি উৎস থেকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র আসে প্রায় ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট, আমদানিকৃত এলএনজি আসে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং গ্রামীণ এলাকায় ব্যবহৃত এলপিজি, যার ৬০ শতাংশ আসে ইরান থেকে। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহও বিঘ্নিত হয়েছে।

২০১৫ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে পাকিস্তান। যখন দেশীয় উৎপাদন চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এলএনজি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে।

কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। ২০২৫ সালে যেখানে প্রতি মাসে ৮ থেকে ১২টি এলএনজি কার্গো আসত, মার্চে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২টিতে। এপ্রিলের নির্ধারিত চালানগুলোর বেশিরভাগই আসবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে দামও বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১০ দশমিক ৪৭ ডলার। এটি যা মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৪৯ ডলারে। মাত্র এক মাসে ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের জ্বালানি পরিকল্পনার বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘমেয়াদি কঠোর চুক্তি। চাহিদা কমলেও এলএনজি কিনতে হয়েছে। ফলে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে গ্যাস খাতে সার্কুলার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিকি ৩ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার)।

যুদ্ধের প্রভাবে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাত বড় সংকটে পড়েছে। এলএনজি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২১ শতাংশের বেশি যোগান দেয়।

এই পরিস্থিতিতে সরকার আগে বন্ধ রাখা দেশীয় গ্যাস উৎপাদন পুনরায় চালু করেছে। পাশাপাশি কয়লা ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপের পরও জ্বালানি ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ সম্ভব নয়।

বর্তমানে শীতল আবহাওয়া ও সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন কিছুটা স্বস্তি দিলেও গ্রীষ্মে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আসন্ন গরমে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হতে পারে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সমানভাবে পড়বে না। যারা গ্রিড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন। শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে যাদের নিজস্ব সোলার ও ব্যাটারি ব্যবস্থা রয়েছে। এতে তারা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকবেন।

সূত্র: আলজাজিরা

    শেয়ার করুন: