কোহিনূর
পুরনো ক্ষত জাগিয়ে তুললেন মামদানি

২০০২ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মা কুইন মাদার এলিজাবেথের মৃত্যুর পর তার কফিনের ওপর রাখা হয়েছিল কোহিনূর রাজমুকুট। ছবি: সংগৃহীত
ইতিহাস, রক্তপাত ও রাজনৈতিক বিতর্কের দিক থেকে কোহিনূরের সমকক্ষ খুব কম হীরাই আছে। এই হীরক খণ্ডটি সংরক্ষিত রয়েছে টেমস নদীর তীরে অবস্থিত টাওয়ার অফ লন্ডনের জুয়েল হাউসে। এখানে সংরক্ষিত রত্নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি না হলেও হীরকটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধ, হত্যা ও দখলদারির মধ্য দিয়ে হয়েছে হাতবদল। ধারণা করা হয়, হীরাটি দক্ষিণ ভারতে উৎপত্তি হয়েছে। মোগল সম্রাট, পারস্যের আক্রমণকারী, শিখ শাসক থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতে গিয়ে পৌঁছায় কোহিনূর।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনের কাছে কোহিনূর ফেরতের দাবি উঠলেও তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে যুক্তরাজ্য। তবে গত সপ্তাহে আবারও নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে ঐতিহাসিক এই হীরক খণ্ডটি।
এরই মধ্যে গত ২৯ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সফরে যান ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস। তিনি নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে সেখানকার মেয়র জোহরান মামদানিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ব্রিটিশ রাজার সঙ্গে তিনি কী বিষয়ে আলোচনা করতে চান। মামদানি উত্তর দেন, ‘আমি যদি রাজার সঙ্গে কথা বলতাম, তাহলে তাকে কোহিনূর হীরা ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাতাম।’
তার এই মন্তব্যের পর শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। নিউ ইয়র্ক পোস্ট মামদানির বক্তব্যকে অভদ্র আখ্যা দিয়ে দাবি করে, এতে সৌজন্য ও বিনয় নেই। তবে তার মন্তব্যে ব্যাপক সমর্থন পায় ভারতে। সেখানে এবার নতুন করে জোরালো হয় কোহিনূর ফেরতের দাবি। বর্তমানে হীরাটি বসানো রয়েছে প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মায়ের মুকুটে।
মামদানির বাবা মাহমুদ মামদানি একজন উগান্ডান শিক্ষাবিদ, লেখক এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তার মা ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং তার বাবা ঔপনিবেশিকতাবিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক। যদিও পরে রাজা চার্লসের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে তিনি কোহিনূরের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘কোহিনূর: দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ইনফেমাস ডায়মন্ড’র সহলেখক ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল বলেছেন, ‘মানুষকে বুঝতে হবে, কোহিনূর এখনো গভীর আবেগের বিষয়। লন্ডনের কাচের বাক্সে রাখা এই ছোট্ট পাথরটির ওপর দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ঔপনিবেশিক যন্ত্রণার প্রতীকী ভার এসে পড়েছে।’
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা অভিশাপের গল্পও প্রচলিত আছে কোহিনূরকে ঘিরে। বলা হয়, পুরুষ মালিকদের জন্য এটি অমঙ্গল বয়ে আনে। হত্যাকাণ্ড, অসুস্থতা কিংবা যুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে তাদের। ব্রিটিশদের হাতে যাওয়ার পরও দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে এটি কেবল রানিরাই পরেছেন, কোনো রাজা নয়।
ডালরিম্পলের ভাষায়, কোহিনূর এখন ঔপনিবেশিক লুট ও শোষণের পকেট আকারের প্রতীক।
তার মতে, রাজা চার্লস যখন যুক্তরাষ্ট্র সফরে ট্রাম্প ও কংগ্রেসকে সামলে প্রশংসা পাচ্ছেন, তখনো কোহিনূর বিতর্ক অস্বস্তিতে ফেলছে তাকে। এই হীরা যুগের পর যুগ, রাজবংশের পর রাজবংশ ধরে সৃষ্টি করে যাচ্ছে বিভাজন।
ডালরিম্পল ও তার সহলেখক অনিতা আনন্দের গবেষণা অনুযায়ী, কোহিনূরকে ঘিরে প্রচলিত বহু কিংবদন্তিই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। মোগলদের কাছে এটি সবচেয়ে বড় বা বিখ্যাত হীরা ছিল না। এমনকি তাদের রত্ন তালিকাতেও আলাদাভাবে এর উল্লেখ ছিল না।
মূলত মোগল সম্রাট শাহজাহানের বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনের অসংখ্য মূল্যবান রত্নের একটি ছিল কোহিনূর। ১৭৩৯ সালে পারস্যের শাসক নাদির শাহ দিল্লি লুট করে এটি নিয়ে যান। তিনিই এর নাম দেন কোহিনূর। যার অর্থ আলোর পর্বত।
নাদির শাহ নিহত হওয়ার পর হীরাটি আফগানিস্তানে যায়। পরে শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রণজিৎ সিং এটি অধিগ্রহণ করেন এবং বাহুতে ধারণ করতেন। তার মৃত্যুর পর এটি তার উত্তরসূরি দুলীপ সিংয়ের হাতে আসে।
১৮৪৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাঞ্জাব দখল করলে মাত্র ১০ বছর বয়সী দুলীপ সিংকে বাধ্য করা হয় লাহোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে। ওই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল কোহিনূর রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল জোরপূর্বক আদায় করা।
ডালরিম্পল বলেছেন, কোহিনূরকে ব্রিটিশরাই সাম্রাজ্যিক গৌরবের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে দেওয়ার পর এটি জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয় এবং ইউরোপীয় রুচির সঙ্গে মানানসই করতে পুনরায় কাটা হয়। পরে এটি ব্রিটিশ রাজমুকুটের অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই কোহিনূর ফেরতের দাবি ওঠে। ভারত সরকার কয়েক দফা আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাইলেও ব্রিটেন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কোহিনূরকে এখন অনেকেই পার্থেনন মার্বেলস বা বেনিন ব্রোঞ্জের মতো ঔপনিবেশিক লুটের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
লন্ডনের টাওয়ারে কোহিনূর দেখতে যাওয়া বহু ভারতীয় পর্যটককে ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করতেও শোনা যায়।
ব্রিটিশ সরকারের দাবি, হীরাটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমেই হস্তান্তর করা হয়েছিল। ২০১০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, কোহিনূর ফেরত দিলে ব্রিটিশ মিউজিয়াম খালি হয়ে যাবে।
তবে বিতর্ক এড়াতে রাজা তৃতীয় চার্লসের অভিষেক অনুষ্ঠানে ঐতিহ্য ভেঙে কোহিনূর ব্যবহার করা হয়নি।
এদিকে ভারতই একমাত্র দেশ নয়, যারা কোহিনূরের দাবি জানায়। ১৯৭০-এর দশকে পাকিস্তানও দাবি তোলে, কারণ লাহোর থেকেই এটি নেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমানে পাকিস্তানের অংশ। পরে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান এমনকি ৯/১১–এর পর নির্বাসিত তালেবান নেতারাও এর মালিকানা দাবি করেন।
ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে বলেছেন, ব্রিটিশদের কোহিনূর আসলে কাকে ফেরত দেওয়া উচিত, সেটাই স্পষ্ট নয়। ঔপনিবেশিকতার ক্ষত মুছে ফেলা সহজ নয়, আর কোহিনূর তার বড় উদাহরণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও কোহিনূর ফেরতের দাবি খুব জোরালোভাবে তোলা হয়নি। তবে ডালরিম্পলের মতে, ভবিষ্যতে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি কূটনৈতিক দরকষাকষির অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
তার ভাষায়, ব্রিটেনকে ক্রমেই ভারতের সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন হবে। ভবিষ্যতের কোনো একসময়ে কোহিনূর বড় ধরনের কূটনৈতিক গ্রেনেডে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান









