ফিলিস্তিনি মায়ের আর্তনাদ
তিন ছেলে ইসরায়েলের জেলে, চোখ রাঙাচ্ছে মৃত্যুদণ্ড

গাজা সিটিতে নিজের তাঁবুর ভেতরে ইনাম আল-দাহদুহ তার আটক বড় ছেলে মাহমুদের ছবি হাতে ধরে আছেন।
গাজার উত্তপ্ত ধুলোবালি আর বোমাবর্ষণের শব্দের মধ্যে একটি জীর্ণ ক্যানভাস তাঁবুর ভেতর বসে আছেন ইনাম আল-দাহদুহ। কোলে তার ছোট ছোট নাতি নাতনি। হাতে ধরা একটি ভাঁজ হয়ে যাওয়া ছবি যেখানে তার তিন যুবক ছেলে মাহমুদ, আলা এবং জিয়া দাঁড়িয়ে আছেন হাসিমুখে।
দুই বছর পার হয়ে গেলেও ছেলেদের সেই হাসিমাখা মুখ আর দেখা হয়নি ইনামের। ২০২৪ সালে তাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী।
গতকাল শুক্রবার বন্দি দিবস পালন করে ফিলিস্তিনিরা। এদিন ইনামেরে চোখে পানি নয়, বরং জমেছে এক গভীর আতঙ্ক। কারণ, ইসরায়েলের নতুন ‘মৃত্যুদণ্ড আইন’ এখন তার ছেলেদের জীবনের জন্য হয়ে উঠেছে বড় হুমকি।
ফিলিস্তিনি বন্দি অধিকার সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমান পরিস্থিতি যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। যুদ্ধের দুই বছরে ইসরায়েলি কারাগারগুলো এখন ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিণত হয়েছে এক বিভীষিকায়।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইসারায়েলি খাঁচায় বন্দি আছেন প্রায় ১০ হাজার ফিলিস্তিনি। যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৫০। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে আটক করা হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ মানুষকে।
কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ৩ হাজার ৫৩০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটকে রাখা হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘প্রশাসনিক ডিটেনশন’।
অবাক করার বিষয় হলো, বড়দের পাশাপাশি ৩৫০ ফিলিস্তিনি শিশুও এখন ইসরায়েলের অন্ধকার সেলে কাটাচ্ছে বন্দি জীবন। গত দুই বছরে কারাগারের ভেতর চরম নির্যাতন ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে শতাধিক ফিলিস্তিনির।
ওদের হবু স্ত্রীরা এখনো অপেক্ষা করছে— বলেছেন ইনাম।
ইনামের মেজো ছেলে আলা আইনের ডিগ্রি নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, আর ছোট ছেলে জিয়া সবেমাত্র শেষ করেছিল হাই স্কুল। দুই ভাইয়েরই বিয়ের কথা ছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে। কিন্তু বিয়ে নয়, তাদের ভাগ্যে জোটে অন্ধকার কারাগার।
ইনাম আরও যোগ করেন, ‘ওদের হবু স্ত্রীরা এখনো অপেক্ষা করছে।’
স্মৃতি হাতড়ে ইনাম জানান, ‘২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আল-শিফা হাসপাতালের কাছে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনারা। ওরা বাড়িতে ঢুকেই শুরু করে এলোপাতাড়ি গুলি। ছোট ছোট বাচ্চারা ভয়ে লুকিয়ে ছিল আমার পেছনে। চোখের সামনে ওরা আমার কলিজার টুকরো তিন ছেলেকে নিয়ে গেল চোখ বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে। ওদের অপরাধ কী ছিল আজও জানি না।’
ইনাম পরিবারের অন্য নারী ও শিশুদের নিয়ে তখন পালিয়ে গেলেও পালাতে রাজি হননি তার স্বামী নাঈম। সেই দিনই ইনামের স্বামী নাঈম শেষবারের মতো ছেলেদের বাঁচাতে বাধা দিয়েছিলেন। ১০ দিন পর বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় নাঈমের ক্ষতবিক্ষত লাশ।
২০২৬ সালের ৩০ মার্চ ইসারায়েলি পার্লামেন্ট এক বিতর্কিত আইন পাস করে, যেখানে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বৈধতা মেলে। যদিও বলা হয়েছে এটি কেবল সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্তদের জন্য, কিন্তু ইনামের মতো হাজারো মা বিশ্বাস করেন, এই আইন আসলে সাধারণ বন্দিদের আইনিভাবে হত্যা করার একটি কৌশল মাত্র।
ছেলেরা কেমন আছে তা জানার কোনো উপায় নেই ইনামের কাছে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিদের কাছে শুনেছেন, তার ছেলেরা হয়তো নেগেভ ও ওফার কারাগারে আছেন।
ইনাম বলেছেন, ‘আমার ছেলেরা পেট্রোল পাম্পে কাজ করত, তারা সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই নতুন আইন হওয়ার পর থেকে রাতে আমার দুচোখের পাতা এক হয় না।’
‘ওরা জেলে না খেয়ে আছে, মার খাচ্ছে এসব ভাবলে বুক ফেটে যায়। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ওদের মেরে ফেলবে। সারা দুনিয়া কি আজ অন্ধ হয়ে গেছে?’
ছেলেরা না থাকলেও তাদের রেখে যাওয়া সন্তানদের আগলে রেখেছেন ইনাম। বড় ছেলে মাহমুদের ছয় সন্তান এখন ইনামের কাছেই বড় হচ্ছে। ইনাম তাদের কুরআন শেখান, বাবার গল্প শোনান। ইনাম মনে করেন, এটাই তার শেষ যুদ্ধ ছেলের ফিরে আসা পর্যন্ত তার সন্তানদের মানুষ করা।
ইনামের এই আকুতি আজ কেবল গাজার একটি তাঁবুর ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আজ বিশ্বের কাছে এক বড় প্রশ্ন যেখানে বন্দিদের ন্যূনতম মানবিক অধিকারটুকুও হুমকির মুখে।
ইনাম চান বিশ্ববাসী যেন মুখ খোলে, কারণ তার কাছে প্রতিটি দিন মানেই ছেলেদের জন্য এক অনিশ্চিত ‘মৃত্যু পরোয়ানা’।






