অসুস্থ মায়ের জন্য ছাদবাগান, বদলে গেল আলামিনের ভাগ্য

ছবি: আগামীর সময়
২০২২ সাল। ধরা পড়ল মায়ের ক্যানসার। চিকিৎসকের পরামর্শ, লাগবে ফরমালিনমুক্ত খাবার। মাকে সুস্থ করতে ছাদে ডালিম গাছ রোপণ। একে একে যুক্ত হলো অনেক ফলদ গাছ। গড়ে উঠল আলামিনের ছাদবাগান। এখন সেই বাগানে চারা বিক্রি করেই মাসে আয় প্রায় ১ লাখ টাকা আলামিনের।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের পাটখাগুড়ি গ্রামে আলামিনের বাড়ি। ক্যানসারে আক্রান্ত মাকে ফরমালিনমুক্ত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গড়েছিলেন ছাদবাগান।
চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে বড় এক সবুজ উদ্যোক্তার স্বপ্নে। বর্তমানে ছাদবাগান থেকে চারা বিক্রি করে মাসে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।
জীবিত অবস্থায় মা ছাদবাগানের ফল খেতে পেরেছেন। বিশেষ করে আনার ফল বেশি পছন্দ করতেন। বেঁচে থাকা অবস্থায় ছেলের বাগান দেখে যেতে পেরেছেন, এটিই আমার জন্য সন্তুষ্টি
আলামিনের মা ২০২২ সালের শুরুর দিকে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি করেন। একপর্যায়ে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাকে ফরমালিনমুক্ত ফল ও সবজি খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। এরপরই নিজের বাড়ির প্রায় ২ হাজার ২০০ স্কয়ার ফুট ছাদ জুড়ে ফল ও সবজির বাগান গড়ে তোলেন ছেলে আলামিন।বর্তমানে সেই বাগানে আনার, আঙুর, মাল্টা, কমলাসহ নানা ধরনের ফলের গাছ রয়েছে। পাশাপাশি বাড়ির সামনে ২০ শতাংশ জমিতে চাষও করছেন বিভিন্ন সবজিও।
ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এই বাগানে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়নি। তবে বর্তমানে বাগানটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা
আলামিন জানান, শুরুতে ছাদবাগান করা তার জন্য সহজ ছিল না। মায়ের সুস্থতার চিন্তা থেকেই একটি ডালিম গাছ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। পরে ইউটিউব ও ফেসবুক দেখে ছাদবাগান সম্পর্কে ধারণা নেন। বাবা-মায়ের পরামর্শে ধীরে ধীরে বাগান বড় করেন।
আলামিনের ভাষ্য, ‘মাকে ফরমালিনমুক্ত ফল খাওয়াতে হবে, এই চিন্তাই আমাকে সাহস দিয়েছে। মা যখন ছাদে এসে বলতেন এখানে ফল হবে না, তখন আরও জেদ কাজ করত। ভাবতাম, সফল হতেই হবে।’
‘জীবিত অবস্থায় মা ছাদবাগানের ফল খেতে পেরেছেন। বিশেষ করে আনার ফল বেশি পছন্দ করতেন। বেঁচে থাকা অবস্থায় ছেলের বাগান দেখে যেতে পেরেছেন, এটিই আমার জন্য সন্তুষ্টি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান’ বলছিলেন আলামিন।
বাগানের বর্ণনা দিয়ে আলামিন জানালেন, বর্তমানে শুধু ফল ও সবজি নয়, বাগান থেকে বিভিন্ন ফলের চারাও উৎপাদন করছেন। একটি অনলাইন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব চারা বিক্রি করেন। এতে তার একটি পুঁজিও গড়ে উঠেছে।
মায়ের ভালোবাসায় ছেলের বাগান তৈরিতে আবেগাপ্লুত আলামিনের বাবা মোহাম্মদ বজলু রহমান। বললেন, ‘ছেলের এই বাগান মায়ের প্রতি ভালোবাসারই প্রকাশ। সে নিজেই বাগানের সব পরিচর্যা করে। এতে পরিবারের খরচও কিছুটা কমছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ও মিজানুর রহমানের মন্তব্য, আলামিনের এই উদ্যোগ শুধু পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তার দেখাদেখি অনেকেই এখন ছাদবাগান শুরু করেছেন।
‘ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এই বাগানে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়নি। তবে বর্তমানে বাগানটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা’— জানালেন আলামিন।




