চুয়াডাঙ্গায় ডিজেল সংকট, সেচহীন মাঠ ফেটে চৌচির

ছবিঃ আগামীর সময়
দেশের অন্যতম ‘শস্য ভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত চুয়াডাঙ্গায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে এখন ‘ডিজেল নেই’ লেখা ব্যানার ঝুলছে। বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ দিতে না পেরে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে পুরো অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
চুয়াডাঙ্গার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন ধানের সবুজ সমারোহ থাকার কথা। বীজতলা প্রস্তুত থেকে শুরু করে চারা রোপণ, সার প্রয়োগ ও নিড়ানির মতো কঠিন সব ধাপ পার করে এখন কৃষকরা অপেক্ষা করছিলেন সেচের মাধ্যমে ফসল ঘরে তোলার। কিন্তু সেই শেষ ধাপেই এসে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজেল সংকট। পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে অনেক জমির ধান গাছ শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে, কোথাও কোথাও মাটিতে ফাটল ধরেছে।
এই সংকটের মধ্যে পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। হাতে ছোট প্লাস্টিকের কন্টেইনার বা ড্রাম নিয়ে তারা এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকেই ফিরছেন খালি হাতে। সামান্য দুই-এক লিটার ডিজেলের জন্য এই দৌড়ঝাঁপ যেন তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
ক্ষুব্ধ কৃষক ফরজ আলী বলেছেন, ‘প্রতিদিন দেড়-দুই লিটার তেল লাগে। পাম্পে গেলে বলে তেল নেই। সেচ দিতে না পারলে জমি ফেটে যাবে, ধান হবে না। আমরা তো পথে বসে যাব।’
অংগন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা কৃষক জিন্টু মল্লিক জানিয়েছেন, দুই দিন ধরে ড্রাম নিয়ে আসছি, কিন্তু ডিজেল পাচ্ছি না। ধানে সেচ দিতে পারছি না। ধানের পাতা পুড়ে যাচ্ছে।
এদিকে ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, সংকটের পেছনে শুধু সরবরাহ ঘাটতি নয়, রয়েছে পরিবহন খরচ ও রেশনিং পদ্ধতির জটিলতা। তাদের অভিযোগ, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
পাম্প মালিক মাহাফুজুর রহমান বলেছেন, ‘একটি গাড়ির তেল ধারণ ক্ষমতা ১৩ হাজার ৫০০ লিটার হলেও আমাদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৮ হাজার লিটার। অথচ পুরো গাড়ির ভাড়াই দিতে হচ্ছে। এতে আমরা লোকসানে পড়ছি।’
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার লিটার। কিন্তু কম বরাদ্দের কারণে একদিনেই সেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে পরদিন আবার শুরু হচ্ছে সংকট।
সরকার দেশজুড়ে রেশনিং পদ্ধতি তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। পাম্প মালিকদের কেউ কেউ ধর্মঘট বা উত্তোলন বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, পুরো গাড়ি তেল ভর্তি করে সরবরাহ না দিলে এই সমস্যা কাটবে না।
কৃষি সমৃদ্ধ এই জনপদে এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ধানের ফলনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চুয়াডাঙ্গার দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ পরিণত হতে পারে শুকনো মাটির প্রান্তরে—যেখানে থাকবে শুধু কৃষকের হতাশা, ক্ষতি আর অপূর্ণ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

