মাদারীপুর
বাঁশের সাঁকোই ২১ গ্রামের মানুষের যাতায়াতের ভরসা

ছবিঃ আগামীর সময়
মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের ২১টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো। আড়িয়াল খাঁর শাখা নদীর ওপর নির্মিত এই সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন পারাপার করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে এমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকার শত শত মানুষ।
বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া, বাংলাবাজার, মাদ্রা বাজার ও তালতলা গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালের ওপর নির্মিত এই সাঁকোই ২১টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। যদিও হেঁটে কোনো রকম পার হওয়া সম্ভব, তবে কোনো ধরনের যানবাহন কিংবা কৃষিপণ্য বহন করা প্রায় অসম্ভব। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে তখন নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় এলাকাবাসীকে। শহরে যেতে হলে একাধিক সাঁকো পার হতে হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
স্থানীয় উদ্যোগে প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ এই বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছরই এলাকাবাসী নিজেরাই এটি মেরামত করে চলাচলের উপযোগী রাখেন। তবে সাঁকোটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বৃদ্ধ ও শিশুরা।
এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো পার হয়। ১২১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালীগঞ্জ মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয়, মাদ্রা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবং তালতলা আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এই সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। সাঁকোর কারণে উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিতে না পেরে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম ফকির বলেছেন, ‘একটি সেতুর অভাবে আমাদের কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে দ্বিগুণ খরচ হয়। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’ তিনি দ্রুত সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী জিদান বলেছেন, ‘আমাদের স্কুলে যেতে এই সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝেই স্কুলে যেতে সাকো থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। তাই অতি জরুরি আমাদের এই সাঁকোটাকে পরিবর্তন করে আমাদের এখানে ব্রিজ দিলে আমাদের স্কুলে যাতায়াতের সুবিধা হবে।’
এদিকে চতুর্থ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী সোহানা আক্তার জানিয়েছেন, ‘আমি ছোট মানুষ এই হাঁগো পারো দিতে হয়। কয়দিন আগে পড়ে গিয়েছিলাম পরে হাতে ব্যথা পাইছি সাঁকো পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়।’
প্রতিদিন সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতে ভয় লাগে। তবু বাধ্য হয়ে যেতে হয়। সে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন একই এলাকার শিক্ষার্থী তানভীর।
স্থানীয় বাসিন্দা আতিয়ার রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও পরে তা আর বাস্তবায়ন করা হয় না। এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্যও প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এ বিষয়ে মাদ্রা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কাজী ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন, হোগলপাতিয়া অঞ্চল থেকে আমাদের কলেজে শিক্ষার্থীরা আসতে অনেক কষ্ট হয়। তিন দশক যাবত এই সাঁকো পার হয়ে শিক্ষার্থীরা আমাদের স্কুলে আসে। আমরা চাই অতি তাড়াতাড়ি ওখানে একটি ব্রিজ হোক যাতে ওই অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা সুন্দরভাবে লেখাপড়া করতে আমাদের এখানে আসতে পারে।’
ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেছেন, ‘সেতু নির্মাণে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং বিষয়টি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে সুপারিশ করা হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, বড় আকারের সেতু নির্মাণের জন্য আলাদা প্রকল্প প্রয়োজন। ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন মিললেই সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে সেতুগুলো করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে এবং বদলে যাবে ২১ গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা।

