২০২৫ সালে লাফার্জহোলসিমের মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি

সংগৃহীত ছবি
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি ২০২৫ সালে শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল অর্জন করেছে। কোম্পানিটির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। বিক্রি বৃদ্ধি, প্রিমিয়াম পণ্যের চাহিদা এবং অ্যাগ্রিগেটস ব্যবসায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির কারণে এই উন্নতি হয়েছে, যদিও নির্মাণ খাতে সামগ্রিকভাবে কিছুটা ধীরগতি ছিল।
কোম্পানির ১১ মার্চ প্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লাফার্জহোলসিমের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৮২ কোটি টাকা। একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব ৬ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ২ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। এছাড়া, পরিচালন মুনাফা ১১ শতাংশ বেড়ে ৬৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৫৮৭ কোটি টাকা।
কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ সীমিত থাকার কারণে নির্মাণ খাত কিছুটা চাপের মধ্যে থাকলেও ব্যবসায়িক গতি ও গ্রাহকদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পৃক্ততার কারণে কোম্পানিটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
উন্নত আর্থিক ফলাফলের ধারাবাহিকতায় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০২৫ অর্থবছরে মোট ৪০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড সুপারিশ করেছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে বছরের শুরুতে ইতোমধ্যে ১৮ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন ক্যাশ ডিভিডেন্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও ২২ শতাংশ চূড়ান্ত ক্যাশ ডিভিডেন্ড প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ডিভিডেন্ডের পরিমাণ প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা, যা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের প্রায় ৪০ শতাংশের সমান।
ডিভিডেন্ড অনুমোদনের জন্য আগামী ১৩ মে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হবে। আর ডিভিডেন্ড পাওয়ার যোগ্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণে রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ এপ্রিল।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল চৌধুরী বলেন, চ্যালেঞ্জিং বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও কোম্পানিটি শক্তিশালী ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি জানান, ২০২৫ সালে সরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকার কারণে নির্মাণ শিল্প কিছুটা চাপের মুখে ছিল। তবুও কোম্পানিটি ভালো পারফরম্যান্স করেছে।
তিনি আরও বলেন, সিমেন্ট ও অ্যাগ্রিগেটস—উভয় খাতেই বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গ্রাহকদের আস্থা ও পণ্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন। এছাড়া উদ্ভাবনী পণ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়াও ব্যবসা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ‘ওয়াটার প্রটেক্ট’ ও ‘ফেয়ার ফেস’ নামের বিশেষায়িত সিমেন্ট পণ্যের বিক্রি গত বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি কোম্পানিটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে। জিওসাইকেল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২০২৫ সালে ৪৫ হাজার টনের বেশি পুনর্ব্যবহার অযোগ্য উপকরণ সহ-প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে প্রায় ১১ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
ইকবাল চৌধুরী বলেন, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারের অস্থিরতার কারণে কিছুটা চাপ থাকলেও ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কোম্পানি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে।
২০২৬ সালের শুরুতেই কোম্পানিটি নতুন বিশেষায়িত সিমেন্ট পণ্য বাজারে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ‘হোলসিম কোস্টাল গার্ড’ এবং রেডিমিক্স কংক্রিট খাতের জন্য ‘পাওয়ারক্রিট’। এসব পণ্যের মাধ্যমে গ্রাহকদের বিশেষ চাহিদা পূরণ এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
২০০৩ সালে গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ দেশের শীর্ষ নির্মাণ উপকরণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা সিমেন্ট খাতে অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগ।
এই বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত সিমেন্ট কারখানা এবং তিনটি গ্রাইন্ডিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে, যা কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ডভিত্তিক হোলসিম গ্রুপ এবং স্পেনভিত্তিক সিমেন্টোস মোলিন্সের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো ও রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য বিভিন্ন ধরনের সিমেন্ট ও নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করে।
আগামী দিনে লাভজনকতা ধরে রাখতে কোম্পানিটি কয়েকটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানির মাধ্যমে কম ব্যয়ের জ্বালানি ব্যবহার, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং কার্যকর মূল্য নির্ধারণ কৌশল জোরদার করা। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে দীর্ঘমেয়াদে বাজার নেতৃত্ব ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

