স্কুলে ফিরছে ‘ভর্তিযুদ্ধ’
মেধা যাচাইয়ের আড়ালে বাড়বে ভর্তি বাণিজ্য!
- ভর্তিযুদ্ধের আড়ালে হবে শত কোটি টাকার ওপেন সিক্রেট বাণিজ্য
- শৈশব পিষ্ট হবে প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে
- পুরোনো রূপে ফিরবে গাইড বই ও প্রাইভেট
- টিউশনের ব্যবসা জীবনের শুরুতেই ‘ফেলের ট্যাগ’ ট্রমায় ভুগবে শিশুরা

প্রতীকী ছবি
দেশের স্কুলগুলোতে দীর্ঘ এক দশক পর আবারও ফিরে আসছে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শনিবার লটারি পদ্ধতি বাতিল করে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। সরকারের এই ঘোষণার পর অন্যদিকে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে দানা বাঁধছে কোচিং বাণিজ্য ও দুর্নীতির পুরোনো শঙ্কা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানান, নামীদামী স্কুলগুলোর ভর্তিতে বাণিজ্য ও প্রভাবশালীদের তদবির বন্ধ করতে ২০২১ সালে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারিতে শিক্ষার্থী বাছাই শুরু হয়। শুরুতে সরকারি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে এই পদ্ধতি শুরু হলেও ধীরে ধীরে বেসরকারি স্কুলেও তা চালু হয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার প্রকৃত মেধা যাচাই করতে সেই পদ্ধতি বাতিল করেছে। তবে ভর্তি পরীক্ষা নামে নতুন করে ভর্তি বাণিজ্য ফিরে আসবে বলে মনে করছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা।
গেল বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি গোপনীয় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। সেখানে রাজধানীর স্বনামধন্য মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তিযুদ্ধের আড়ালে গত দুই যুগ ধরে শত কোটি টাকার ভর্তি বাণিজ্যের চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে ২০১৬ সালেই অবৈধভাবে ২,২৩৫ শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর তথ্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ২০০৯-২০২৫ পর্যন্ত এই ১৬ বছরে সেই অবৈধ ভর্তির সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ হাজারের বেশি। প্রতিটি ভর্তিতে ৩ থেকে ১০ লাখ টাকার লেনদেনে বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৩ কোটি টাকা। এই বাণিজ্যে সরাসরি জড়িত ছিল ম্যানেজিং কমিটি থেকে অধ্যক্ষ পর্যন্ত প্রভাবশালী একটি মহল। শুধু আইডিয়াল নয়, রাজধানী থেকে জেলা পর্যন্ত বহু নামী স্কুলে তদবিরে ভর্তি কিংবা টাকার বিনিময়ে ভর্তি করানো ছিল একপ্রকার ওপেন সিক্রেট। এমন খারাপ নজিরের মধ্যে ২০১১ সালে প্রথম সরকারি স্কুলে পর্যায়ক্রমে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি চালু করে সরকার।
শনিবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন লটারি ব্যবস্থাকে যুক্তিসঙ্গত মনে করেন না এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই ফের ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানান। তার মতে, লটারিতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই হচ্ছে না। তবে তার এমন যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক প্রধান ও শিক্ষাবিদ।
তারা বলছেন, মেধা যাচাইয়ের আড়ালে আবারও শত শত কোটি টাকার ভর্তি বাণিজ্য ও প্রভাবশালীদের তদবির শুরু হবে। এক দশক ধরে স্কুলে ভর্তির শৃঙ্খলা ফের নষ্ট হবে। শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ফিকে হয়ে যাবে শিশুদের শৈশব। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার তালিকাও দীর্ঘ হবে। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অল্প বয়সী শিশুদের ওপর ব্যাপক মানসিক চাপ তৈরি হয়। কাঙ্ক্ষিত স্কুলে জায়গা না পেলে শিশুদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও ব্যর্থতার বোধ থেকে দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। যা পরবর্তী জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক বলেন, ভর্তি পরীক্ষা মানেই শুধু মেধা যাচাই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় কোচিং নির্ভরতা, আর্থিক বৈষম্য, সামাজিক চাপ এবং ভর্তি বাণিজ্য। অতীতে আমরা দেখেছি ভর্তির নামে কীভাবে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু পদ্ধতি পরিবর্তন করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং পুরোনো সংকটগুলো নতুনভাবে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি নন। তিনি বলেন, সরকারের আদেশ মেনেই শিক্ষার্থী ভর্তি করাবেন। লটারি নাকি ভর্তি পরীক্ষা কোনটি ভালো, এই বিষয়ে তার কৌশলী বক্তব্য হলো, লটারির মাধ্যমে তারা ভালো ছিলেন। এখন ভর্তিযুদ্ধ শুরু হলে ফের তদবির বাড়বে এবং তারাও অস্বস্তির মধ্যে থাকবেন।
ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণায় অভিভাবকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের একজন অভিভাবক জাকির হোসেন জানান, স্কুলে একাডেমিক কোচিং না করালে অনেক সময় বাচ্চাদের নম্বর কম দেওয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের চাপ তৈরি করা হয়। এখন যদি ভর্তি পরীক্ষা চালু হয়, তাহলে কোচিং ব্যবসায় নতুন করে ঝোঁক বাড়বে।
প্রাথমিক স্তরে ভর্তিতে কোনোভাবেই পরীক্ষা নেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। তার মতে, ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া মানেই ফের কোচিং বাণিজ্য শুরু হবে। শিশুদের মেধা যাচাইয়ের নামে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া মানেই বড় একটি অংশকে জীবনের শুরুতেই ফেল করার ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে দেওয়া। যা একজন শিশুকে ট্রমার মধ্যে ফেলতে পারে।
চলতি শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করানো হয়, যা সরাসরি তদারকি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাউশির তথ্য বলছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট শূন্য আসন ছিল ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২৮১টি। এর বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪টি। আপাতদৃষ্টিতে আসন বেশি মনে হলেও আসল লড়াই ছিল নামী সরকারি স্কুল ও গুটি কয়েক বেসরকারি স্কুলকে কেন্দ্র করে। সরকারি স্কুলে ১ লাখ ২১ হাজার ৩০টি আসনের বিপরীতে আবেদন করে মোট ৭ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৪ জন। অর্থাৎ প্রতি আসনের বিপরীতে আবেদন করে ৬ জন।
অন্যদিকে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল, ভিকারুননিসা নূন, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ বা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের মতো নামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিত্রটি ছিল আরও প্রকট।
মাউশির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পছন্দের তালিকায় প্রথম সারির স্কুলগুলোতে একটি আসনের বিপরীতে ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। যেখানে একটি সরকারি স্কুলে একটি আসনের বিপরীতে ৬ জন লড়ছে, সেখানে বেসরকারি নামী স্কুলগুলোতে আসন পূর্ণ হওয়ার পরও হাজার হাজার শিক্ষার্থী ওয়েটিং লিস্টে থেকে যায়।
অন্যদিকে নামী স্কুলের মোহে সবাই দৌড়ঝাঁপ করলেও সাধারণ বা মাঝারি মানের বেসরকারি স্কুলগুলো শিক্ষার্থী সংকটে পড়ে। সারাদেশে বেসরকারি স্কুলে মোট ১০ লাখ ৭২ হাজার ২৫১টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়ে মাত্র ৩ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৬টি। অর্থাৎ সব আসন পূরণের পরও প্রায় ৮ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আসন শূন্য থেকে যায়। অর্থাৎ একদিকে নামী স্কুলে ভর্তির জন্য হাহাকার, অন্যদিকে সাধারণ স্কুলে বসার লোক নেই।
এমন পরিস্থিতিতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলে নামী স্কুলগুলো ফিল্টারিং করে ভালো শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে। অন্যদিকে সাধারণ ও মাঝারি মানের স্কুলে তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। এতে ভালো স্কুল আরও ভালো করবে, অন্যরা শুধু খারাপ ফল করবে। এতে স্কুলে স্কুলে চরম বৈষম্য তৈরি হবে।
রাজধানীর প্রথম সারির একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্তে তাদের প্রচণ্ড চাপে থাকতে হবে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ভর্তিকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীদের তদবির সহ্য করতে হবে। তার মতে, এতে শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশের পরিবর্তে মুখস্থ করার প্রবণতা বাড়বে।
শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষা-কেন্দ্রিক ভর্তি চালু হলে দেশজুড়ে ফের কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা শুরু হবে। অভিভাবকরাও সন্তানদের বাড়তি প্রস্তুতির জন্য কোচিং ও প্রাইভেট টিউটরের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। ভর্তি কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কোচিং আবারও চালু হবে। যেকোনো মূল্যে সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে অনেক অভিভাবক জালিয়াতি বা দুর্নীতির আশ্রয়ও নিতে পারেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুদের জন্য পরীক্ষা-নির্ভর ভর্তি ব্যবস্থার পরিবর্তে এলাকাভিত্তিক স্কুলিং বা লটারি পদ্ধতি চালু রাখা জরুরি।
গত এক যুগে ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্তরা লটারি প্রথা বাতিলের পক্ষে একটি খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করায়। তারা প্রচার করে, লটারির কারণে মেধা ও যোগ্যতা পুরোপুরি ভাগ্যের ওপর নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, লটারির কারণে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা কমে যাচ্ছে।
যেভাবে আসে লটারি পদ্ধতি
২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় (যেসব বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি রয়েছে) প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনও পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো। পরবর্তী সময়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম চলছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে এনে সরকার নিজেই তদবির ও বাণিজ্যের পথে এগোচ্ছে। তার ধারণা, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তদবির এড়াতে শিক্ষামন্ত্রী ফোন বন্ধ ও দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন। তিনি বলেন, সরকার যেহেতু আগেভাগেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে, তাই তাড়াহুড়ো না করে এ সেক্টরের সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু জানান, লটারি পদ্ধতি চালুর পরও অনেক স্কুলে পর্দার আড়ালে ভর্তি বাণিজ্য চলেছে। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষা মানেই সিন্ডিকেট গোষ্ঠীকে সুযোগ করে দেওয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনোভাবেই এই অশুভ সিন্ডিকেট ও ভর্তি বাণিজ্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

