তারকাদের চুপ থাকা ‘অপরাধ’, কথা বললে ‘বিপদ’

ব্যাড বানি, টেইলর সুইফট, বিলি আইলিশ। ছবি: টুইটার
হলিউডসহ বিশ্ব বিনোদন জগতে এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তারকারা কথা বললে বিপদ, আবার চুপ থাকলেও সমালোচনার মুখে পড়ছেন। রাজনৈতিক বা সংবেদনশীল বিষয়ে মন্তব্য করলে যেমন ‘বিতর্কিত’ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তেমনি কিছু না বললেও এখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। বিতর্কিত যেমন হওয়া যাবে না, স্পষ্টভাষীও হওয়া যাবে না।
মার্কিন বিনোদন সাময়িকী দ্য হলিউড রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একজন অভিজ্ঞ জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, এই পরিস্থিতি যেন একেবারে ‘মাইনফিল্ড’ এর মতো। তার মতে, এখন সবকিছু মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ই থাকে না। তার ভাষায়, এখন অনেক তারকাই ইচ্ছাকৃতভাবে চুপ থাকছেন। কারণ, ‘কিছু বললে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যেতে পারে। প্রতিক্রিয়া জানানোও কঠিন।’
বেশিরভাগ সময় তারা বুঝতেই পারেন না কী বলা উচিত। কারণ তখন কিছু বললে সেটি আরও আগুনে ঘি ঢালার মতো হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই এখন অনেক তারকা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মন্তব্য না করার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এই নীরবতাও এখন সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিনেতারা যতই নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ রাখতে চান না কেন, ইন্টারনেট এখন কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না।
অভিনেত্রী সিডনি সুইনির ঘটনাটিকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। তার করা জিন্স ব্রান্ড আমেরিকান ঈগলের বিজ্ঞাপন ঘিরে অনলাইনে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা সেই বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, সুইনি একটি বিছানায় শুয়ে জিন্স পরছেন। ভিডিওতে তার কণ্ঠে শোনা যায়- ‘জিন পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে যায় এবং তা চুলের রঙ, ব্যক্তিত্ব বা চোখের রঙের মতো বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। আর আমার জিন্স নীল।’ এরপর এক বর্ণনাকারী বলেন ‘সিডনি সুইনির জিন্স দারুণ’। যা নিয়ে অনেকেই অভিযোগ তোলেন, এটি নাকি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ইউজেনিক্স চিন্তাধারাকে উৎসাহিত করছে। এই অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতেও সিডনি সুইনি বিভিন্নভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, তিনি রাজনীতি নিয়ে কথা কখনোই বলেন না। কিন্তু এই অবস্থানও তাকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। বরং পুরো বিতর্কে তাকে ব্যাপক চাপের মুখে পড়তে হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন জানা যায় ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনার আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং পুরো বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।
একইভাবে সংগীতশিল্পী জেলি রোল বিতর্কে পড়েন শুধুমাত্র রাজনীতি এড়িয়ে যাওয়ার কারণে। ২০২৬ সালের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের ব্যাকস্টেজে তিনি বলেন, তিনিও কারও রাজনৈতিক মতামত নিয়ে মাথা ঘামান না, তার রাজনৈতিক ভাবনা নিয়েও মানুষের মাথাব্যাথা হওয়া উচিত নয়। এই মন্তব্যের পর আরঅ্যান্ডবি শিল্পী এরিক বেনেট তাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন এবং বলেন, তিনি ‘ভণ্ডামি’ করছেন।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও এই চাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বরাবরই রাজনৈতিক আলোচনা স্বাগত জানায়। উৎসবে অভিনেত্রী মিশেল ইয়োহকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি এই বিষয়ে মন্তব্য করার উপযুক্ত ব্যক্তি নন। একইভাবে অভিনেতা নীল প্যাট্রিক হ্যারিসের ‘সানি ড্যান্সার’ চলচ্চিত্রে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত রাজনৈতিক বার্তা আছে কি না জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে অভিনেতা বলেন, চলচ্চিত্রকে কখনো রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেন না তিনি। কিন্তু এই ধরনের উত্তরও সমালোচনার হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে পারেনি।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পপ তারকা টেইলর সুইফটের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ভক্ত ও সাংবাদিকরা নিয়মিত তাকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা-ইসরায়েল সংঘাত বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নিয়ে অবস্থান জানাতে চাপ দেন। উত্তর দিতে না পারা নাকি তাকে মানসিকভাবে চাপে রাখে। তিনি বেশিরভাগ সময় নীরব থাকেন। মাঝে মাঝে ব্যতিক্রমও ঘটেছে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রকাশ্যে কমলা হ্যারিসকে সমর্থন জানান।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ শুধু তারকাদের জন্য নয়, তাদের জনসংযোগ টিমের জন্যও অত্যন্ত চাপের। এক শীর্ষ জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, তিনি সব সময় ‘হাই অ্যালার্ট’ থাকেন। কারণ, লালগালিচায় হঠাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প-সম্পর্কিত একটি প্রশ্নই কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রচারণা ভেস্তে দিতে পারে। আরেকজন প্রতিনিধি বলেন, নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে গিয়ে কোনো বিষয়ে মন্তব্য করলে মাত্র পাঁচ সেকেন্ডেই কেউ বিতর্কিত হয়ে যেতে পারেন।
অন্য এক অভিজ্ঞ জনসংযোগ কর্মকর্তা, যার ক্লায়েন্টদের মধ্যে অস্কারজয়ী তারকারাও আছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এখন একটি ছোট ভিডিও ক্লিপ মুহূর্তেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল দর্শকের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে। মানুষ ততক্ষণে নিজেদের মতো মতামত দাঁড় করিয়ে ফেলে।
তবে সব তারকা নীরব থাকছেন না। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়েই কথা বলছেন। সংগীতশিল্পী ব্যাড বানি ও বিলি আইলিশ ২০২৬ সালের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড মঞ্চে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন। এতে রক্ষণশীল মহল থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া আসে। ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব কেভিন ও’ লিয়ারি তাদের ‘চুপ থেকে শুধু বিনোদন দেওয়ার’ পরামর্শ দেন। আর সিনেটর টেড ক্রুজ মন্তব্য করেন, দুর্নীতিগ্রস্ত বিনোদন জগতের নিজেদের নিয়ে ভাবা উচিত। রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের কারণে শুধু সমালোচনাই নয়, পেশাগত ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে।
অভিনেত্রী মেলিসা ব্যারেরা গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পর একটি বড় বাজেটের সিনেমা থেকে বাদ পড়েন। একইভাবে সুসান সারান্ডনও বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তার এজেন্সি থেকে বাদ পড়েন। এই পরিস্থিতিতে অনেক তারকা যেন ভাগ্যের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছেন সিদ্ধান্ত কথা বলবেন, নাকি চুপ থাকবেন। এক জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি একজন তারকাকে জিজ্ঞেস করা হয় ‘কিছু বলার জন্য সমালোচিত হবেন, নাকি না বলার জন্য?’ তাহলে অনেকেই হয়তো নীরবতাকেই বেছে নেবেন। কারণ, কিছু না বললে অন্তত নিজের কথার জন্য সরাসরি দায়ী হতে হয় না; বরং সেটি নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
কৌতুক অভিনেত্রী টিগ নোটারো মনে করেন, ঝুঁকি থাকলেও নিজের বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সবসময় নিজের জীবনযাপন ও কাজের মাধ্যমে তার অবস্থান প্রকাশের চেষ্টা করেন। আগে হোক বা এখন, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন তাকে আরও বেশি সরব হতে হয় আর তখন তিনি মনে করেন, ঝুঁকি নেওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। তার কথায়, ‘এটা অবশ্যই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য, কিন্তু পৃথিবী নিজেই তো এখন ভারসাম্যহীন।’

