আশা ভোঁসলে নামের সেই চিরতরুণ কণ্ঠের গল্প

আশা ভোঁসলে
ভারতীয় সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়ল। আশা ভোঁসলে যিনি শুধু একজন গায়িকা ছিলেন না, বরং কয়েক প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা আর চঞ্চলতার নাম। তাঁর মৃত্যতে একটি যুগের অবসান হলো। দীর্ঘ আট দশকের ক্যারিয়ারে তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন যে, সুরের কোনো সীমানা নেই।
আশা ভোঁসলের শুরুটা ছিল দিদি লতা মঙ্গেশকরের বিশাল ছায়ার নিচে। লতা যখন তার গম্ভীর আর নিখুঁত গায়কী দিয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছেন, আশা তখন বেছে নিলেন এক ভিন্ন পথ। তিনি গানে নিয়ে এলেন ঘরোয়া ঢঙ, একটু দুষ্টুমি আর একরাশ হাসি। শুরুর দিকে গীতা দত্তের গায়কীর সাথে তার মিল থাকলেও খুব দ্রুতই তিনি নিজের আলাদা এক ঘরানা তৈরি করে ফেলেন।
পঞ্চাশের দশকে সংগীত পরিচালক ওপি নাইয়ারের সাথে আশার জুটি ভারতীয় সংগীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। নাইয়ারের দ্রুত লয় আর পাশ্চাত্য ধাঁচের সুরকে আশা নিজের কণ্ঠের জাদুতে জীবন্ত করে তোলেন। ‘বাপ রে বাপ’ সিনেমার সেই ‘পিয়া পিয়া পিয়া’ গান থেকে শুরু করে ‘নয়া দৌড়’ সিনেমার ‘উড়েন জব জব জুলফেন তেরি’ প্রতিটি গানেই আশার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত শক্তি ও তারুণ্য। দিদি লতা মঙ্গেশকরের বাইরেও যে একটি সমান্তরাল গানের জগত তৈরি হতে পারে, তা এই জুটিই প্রমাণ করেছিল।
আশার জীবনটা সবসময় রঙিন ছিল না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে নিজের দিদির সেক্রেটারি গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করে ঘর ছাড়েন তিনি। কিন্তু সেই সংসার সুখের হয়নি। বলা হয়, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন। তখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। দিদি লতার সাথেও দীর্ঘ সময় তার কথা বলা বন্ধ ছিল। এই কঠিন বাস্তবতাকে সাথে নিয়েই তিনি গানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন।
শচীন দেব বর্মণ আশার ভেতর থেকে বের করে এনেছিলেন এক গভীর ও মরমী কণ্ঠস্বর। ‘বন্দিনী’ সিনেমার ‘আব কে বরস ভেজ ভাইয়া কো বাবুল’ গানটির কথা ধরুন। এস ডি বর্মণ আশাকে বলেছিলেন গানের অভিনয়ের চেয়ে নিজের জীবনের ফেলে আসা কষ্টগুলোকে মনে করতে। সেই গানের প্রতিটি শব্দে বাড়ির জন্য একজন মেয়ের যে আকুলতা ফুটে উঠেছিল, তা আজও মানুষকে কাঁদায়।
সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণ বা পঞ্চমের সাথে আশার জুটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি। ‘ও হাসিনা জুলফন ওয়ালি’ বা ‘পিয়া তু আব তো আজা’ এর মতো গানগুলো দিয়ে তারা পুরো ভারতকে নাচিয়েছিলেন। তবে আশার সুরে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন পঞ্চম নিজেই। তাদের প্রথম সাক্ষাৎ ছিল বেশ নাটকীয়। এক সাক্ষাৎকারে আশা জানিয়েছিলেন, এক পাতলা, ফর্সা এবং মোটা ফ্রেমের চশমা পরা ছেলে তার কাছে অটোগ্রাফ চাইতে এসেছিল। সেই ছেলেই ছিল রাহুল দেব বর্মন। সে সময় পঞ্চম কলকাতায় কলেজ ড্রপ-আউট। আশা তাকে পড়াশোনা শেষ করার পরামর্শ দিলে তিনি নাকি বেশ কয়েকদিন গাল ফুলিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু সংগীতের টানে সেই বন্ধুত্ব গাঢ় হতে সময় লাগেনি।
পঞ্চম কেবল আশার ব্যক্তিত্ব নয়, বরং তার কণ্ঠের প্রেমে পাগল ছিলেন। মজার ছলে আশা একবার বলেছিলেন, ‘পঞ্চম সবসময় আমার সুরের প্রশংসা করত। সে আমার কণ্ঠের ওপর ফিদা ছিল। পিছনে পড়েই থাকত। শেষে আর কী করতাম? হ্যাঁ বলে দিলাম।’ ১৯৮০ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের কাজের সেরা সময় ছিল আশির দশকে। ‘ইজাজত’ সিনেমার ‘মেরা কুছ সামান’ গানটির কথা ভাবলে আজও অবাক হতে হয় ছন্দহীন গদ্যের মতো লিরিককে আশা কীভাবে এক অমর স্মৃতিতে রূপ দিয়েছিলেন!
পুরো পৃথিবী লতা আর আশার মাঝে এক অদৃশ্য লড়াই দেখতে চাইত। অনেকে ভাবতেন তারা একে অপরের শত্রু। কিন্তু আসলে তাদের সম্পর্ক ছিল অম্ল-মধুর। বাইরে থেকে সমীকরণ যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত তারা একে অপরের বড় আশ্রয় ছিলেন। লতা চলে যাওয়ার পর আশা যেন একাকী এক মহীরুহে পরিণত হয়েছিলেন।
আশা ভোঁসলে কখনও থেমে থাকেননি। নব্বইয়ের দশকে তিনি গেয়েছেন ‘রঙ্গিলা রে’, আবার নব্বই বছর বয়সেও তিনি হলিউডের ‘গরিলাজ’ ব্যান্ডের সাথে কোলাবরেশন করেছেন কিংবা ব্রেট লি-র সাথে গেয়েছেন। তার কাছে বয়স ছিল স্রেফ একটা সংখ্যা।
সোমবার বিকেল ৪টায় শিবাজি পার্কে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে ও অন্যান্য স্বজনরা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কাচের কফিনে রাখা হয় তার মরদেহ এবং পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
আশা ভোঁসলে আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার গানগুলো সবসময় আমাদের আশেপাশে থাকবে। যখনই কোনো ট্যাক্সিতে ‘জাইয়ে আপ কাহাঁ জায়েঙ্গে’ বাজবে কিংবা কোনো নিঝুম রাতে ‘কাত্রা কাত্রা’ কানে আসবে, তখনই বোঝা যাবে কিংবদন্তিরা আসলে কখনো বিদায় নেন না। তারা বেঁচে থাকেন প্রতিটি তালের ভাঁজে, প্রতিটি সুরের স্পন্দনে।
আশা ভোঁসলে ছিলেন, আছেন এবং চিরকাল আমাদের জীবনের সুর হয়ে থাকবেন।



