মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় নতুন বিভ্রান্তি: এআই ভিডিওতে রুশ হামলার দাবি

ছবিঃ আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও বৈশ্বিক সামরিক পরিস্থিতিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ভিডিও ও দাবি প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে যেকোনো বিস্ফোরণ বা যুদ্ধের দৃশ্য দ্রুতই আন্তর্জাতিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে-যার অনেকগুলোরই বাস্তব ভিত্তি নেই।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেমনি একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়- একটি বিকট বিস্ফোরণের পর আকাশজুড়ে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠছে।
নাটকীয় সেই দৃশ্য দেখে অনেকেই এটিকে সাম্প্রতিক কোনো যুদ্ধ বা হামলার ঘটনা হিসেবে ধরে নিয়ে শেয়ার করছেন।
এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভ্লাদিমির পুতিনের নাম ও ছবি ব্যবহার করা একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয়, কুয়েতে মার্কিন F-15 যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। পোস্টে বলা হয়, এটি ছিল রাশিয়ার পক্ষ থেকে সরাসরি একটি আক্রমণ। একই সঙ্গে দাবি করা হয়, ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি F-15 যুদ্ধবিমান হারানো হয়েছে। পোস্টের শেষে “Pray Russia” লিখে রাশিয়ার জন্য প্রার্থনার আহ্বান জানানো হয়।
পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং অনেক ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হামলা হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
ভিডিওটির কয়েকটি কী-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে এর সবচেয়ে পুরোনো সংস্করণ পাওয়া যায় “প্যারালেলভার্স_নেট” নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রথম প্রকাশ করা হয় গত ৩ মার্চ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ভিডিওটির ক্যাপশনেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এটি এআই ব্যবহার করে তৈরি। সেখানে লেখা রয়েছে, “এই ভিডিওটি এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এবং শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।”
অর্থাৎ, ভাইরাল হওয়া বিস্ফোরণের দৃশ্যটি কোনো বাস্তব ঘটনার ভিডিও নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি একটি কনটেন্ট।একই ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখান থেকে আরও পাঁচটি যুদ্ধসংক্রান্ত ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত তিনটি ভিডিওর ক্ষেত্রেও নির্মাতা নিজেই সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ভিডিওটির ভিজ্যুয়াল উপাদানে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে- ধোঁয়ার গতিপ্রকৃতি, আলোর প্রতিফলন এবং বিস্ফোরণের স্তরবিন্যাস বাস্তব ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের অসঙ্গতি এআই-জেনারেটেড কনটেন্টে প্রায়ই দেখা যায়।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্কের (আইএফসিএন) সদস্য ইতালি ভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ফ্যাক্টা থেকেও একই ভিডিও নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো বলে নিশ্চিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই বাস্তবসম্মত যুদ্ধ, বিস্ফোরণ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব। ফলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চাঞ্চল্যকর ভিডিও শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, কুয়েতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও মার্কিন F-15 যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি একটি বিনোদনমূলক কনটেন্ট, যা ভুয়া দাবির মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে।

