আগামীর সময়

ঈদের নামাজ হোক নান্দনিক সব মসজিদে

ঈদের নামাজ হোক নান্দনিক সব মসজিদে

ছবিঃ আগামীর সময়

পবিত্র ঈদুল ফিতরের সকালে নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে প্রধান কাজ ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া। আমাদের দেশে ঈদ কেবল উৎসব নয়, বরং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্য আর ধর্মীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। রাজধানী ঢাকাকে যেমন ‘মসজিদের শহর’ বলা হয়, তেমনি দেশের প্রতিটি কোণায় এখন দাঁড়িয়ে আছে নান্দনিক সব স্থাপত্য।

ঈদের নামাজ কোথায় পড়বেন এমন ভাবনায় যারা রয়েছেন, তাদের জন্য বাংলাদেশের শৈল্পিক ও ঐতিহ্যবাহী জামাত কেন্দ্রগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে আমাদের আজকের এই আয়োজন।

জাতীয় মর্যাদা ও ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাজধানী ঢাকার প্রধান ও কেন্দ্রীয় জামাত প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হবে হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই মাঠে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন। যারা বিশাল পরিসরে এবং রাষ্ট্রীয় গাম্ভীর্যের মধ্যে নামাজ আদায় করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটিই প্রথম পছন্দ।

অন্যদিকে, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশ থেকে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের পদচারণায় এখানে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়, যেখানে আভিজাত্য আর ধর্মপ্রাণতার এক অপূর্ব মিলন ঘটে।

আবার আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে বর্তমানে সবার নজর কাড়ছে মাদানি এভিনিউয়ের ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত ‘মসজিদ আল মুস্তফা’।

পাঁচতলা এই মসজিদের সম্মুখভাগ পবিত্র কাবা শরিফের আকৃতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা দূর থেকেই মুসল্লিদের মনে এক ঐশ্বরিক অনুভূতির জন্ম দেয়। এর স্থাপত্যশৈলী এমন যে, কোনো জানালা ছাড়াই জ্যামিতিক কারুকাজের মাধ্যমে প্রাকৃতিক আলোয় পুরো মসজিদ আলোকিত থাকে। চলন্ত সিঁড়ি, দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি এবং ক্লান্ত মুসল্লিদের বিশ্রামের জন্য নামাজের সারিতে বেঞ্চের মতো ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা একে আধুনিক প্রকৌশলের অনন্য উদাহরণে পরিণত করেছে। প্রায় ১০ হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই মসজিদে ইবাদতের পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত ও নিবিড়।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য আর পরকালীন ভাবনার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায় আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন ‘মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদে’। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদটি জীবনের কোলাহল আর কবরের নিস্তব্ধতার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩ কাঠা জমির ওপর নির্মিত এই মসজিদের বিশেষত্ব হলো, এর ভেতর থেকে কবরস্থানের সারি সারি কবরগুলো সরাসরি দেখা যায়, যা মুসল্লিকে মুহূর্তেই এক আধ্যাত্মিক জগতের স্বাদ দেয়। আধুনিক ইটের কারুকাজ আর মুসলিম স্থাপত্যকলার নিখুঁত ছাপ সম্বলিত এই মসজিদে প্রায় ২ হাজার মানুষ একত্রে নামাজ পড়তে পারেন। মৃত্যুর প্রতীকি সান্নিধ্যে এমন শৈল্পিক পরিবেশে নামাজ আদায় করা মুসল্লিদের জন্য এক বিরল আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।

ঢাকার ভেতরে আভিজাত্য ও প্রশান্তির খোঁজে যারা বের হন, তাদের কাছে ধানমণ্ডির সোবহানবাগ ও তাকওয়া মসজিদ অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোডের সোবহানবাগ জামে মসজিদটি তার বিশাল ধারণক্ষমতা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য সুপরিচিত।

অন্যদিকে, ধানমণ্ডি ১২/এ লেক সংলগ্ন তাকওয়া মসজিদের খোলামেলা নকশা আর লেকের স্নিগ্ধ বাতাস ইবাদতে এক অনন্য একাগ্রতা এনে দেয়। এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এসবিজি কর্পোরেট মসজিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদও গাম্ভীর্য ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার জন্য মুসল্লিদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। এই প্রতিটি স্থানেই আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ঢাকার অদূরেই কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে অবস্থিত ‘সাউথ টাউন জামে মসজিদ’ এবং আশুলিয়ার নদীর তীরে অবস্থিত ‘জেবুননিসা মসজিদ’ স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য দারুণ আকর্ষণ। সাউথ টাউন মসজিদটি দেখতে অনেকটা রাজপ্রাসাদের মতো, যার দুই স্তরের জানালা দিয়ে আসা আলো ভেতরে মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। অন্যদিকে, জেবুননিসা মসজিদটি কোনো গম্বুজ ছাড়াই জ্যামিতিক নকশার ওপর ভিত্তি করে ইটের অনন্য স্থাপত্যে নির্মিত। নদীর তীরের স্নিগ্ধ বাতাস আর খোলামেলা নকশা মুসল্লিদের এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়।

এছাড়া টাঙ্গাইলের ২০১ গম্বুজ মসজিদ বর্তমানে উপ-মহাদেশের অন্যতম আধুনিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর ৩০১ ফুট উচ্চতার মিনার এবং চীন থেকে আনা রঙিন মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ এক বিশালাকার ধর্মীয় ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ঐতিহ্যের খোঁজে যারা ঢাকার বাইরে যেতে চান, তাদের জন্য নরসিংদীর বেলাব বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদটি এক বিশেষ স্থান। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই ‘ফজিলতের মসজিদটি’ বর্তমানে বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুল কাদির মোল্লার অর্থায়নে আধুনিক ও শিল্পমন্ডিত রূপ পেয়েছে। প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বর্তমান কাঠামোতে ১২ হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতা থাকলেও বিশেষ দিনে ২০ থেকে ২২ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সুনিপুণ নির্মাণশৈলী আর অলৌকিক ইতিহাসের মিশেলে এই মসজিদটি এখন নরসিংদী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

একইভাবে বরিশালের গুটিয়া মসজিদ (বাইতুল আমান) মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্যশৈলী আর ১৯৩ ফুট উচ্চতার মিনারের জন্য এশিয়াজুড়ে পরিচিত। এই কমপ্লেক্সের ভেতরে কাবা শরিফ ও জমজম কূপসহ বিভিন্ন পবিত্র স্থানের মাটি সংরক্ষিত আছে।

ঈদের আনন্দে নারীদের অংশগ্রহণ এখনকার সময়ের এক ইতিবাচক ও আধুনিক রূপান্তর। দেশের অনেক বড় ও আধুনিক মসজিদে নারীদের জন্য নিরাপদ ও পৃথক ব্যবস্থাপনায় নামাজ আদায়ের চমৎকার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ছাড়াও মেয়র হানিফ জামে মসজিদ, বায়তুল মোকাররম, সোবহানবাগ ও তাকওয়া মসজিদ এবং ধানমণ্ডি ৮ নম্বর রোডের বায়তুল আমান মসজিদে নারীদের জন্য আলাদা ও সুপ্রশস্ত জায়গা সংরক্ষিত থাকে। এছাড়া গুলশানের আজাদ মসজিদ, মহাখালী গাউছুল আজম জামে মসজিদ এবং উত্তরা ও মিরপুরের বিভিন্ন সেক্টর মসজিদগুলোতেও নারীদের জন্য জামাতের সুব্যবস্থা রয়েছে। ইউনাইটেড সিটির মসজিদ আল মুস্তফাতেও নারীদের জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক ব্যবস্থা, যা সপরিবারে ঈদের নামাজ আদায়ের অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ ও প্রশান্তিময় করে তোলে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহে যারা ঈদের নামাজ আদায় করতে চান, তাদের জন্য জামালপুরের বকশীগঞ্জে ‘মসজিদে নূর’ (আল নূর) হতে পারে সেরা গন্তব্য। ৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মার্বেল পাথরের তৈরি এই শুভ্র মসজিদটিতে সুউচ্চ চারটি মিনার এবং ৭টি গম্বুজ রয়েছে। চারপাশের সবুজ ফসলের মাঠ আর ঝাউগাছের সারির মাঝে এই মসজিদটি মুসল্লিদের এক অপার্থিব প্রশান্তি দেয়।

জামাতের বিশালতার কথা ভাবলে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান এবং দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দিনাজপুরের বিশাল মাঠে ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জামাত হিসেবে স্বীকৃত। বিভাগীয় শহরগুলোর প্রধান জামাত কেন্দ্রগুলোও নিজস্ব স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ, রাজশাহীর শাহ মখদুম কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, খুলনার সার্কিট হাউজ মাঠ কিংবা সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দান প্রতিটি স্থানই মুসল্লিদের কাছে সমানভাবে আকর্ষণীয়। এই স্থানগুলোয় কেবল নামাজই নয়, বরং বিশাল জামাতে একে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। উৎসবের সকালে মেয়র হানিফ মসজিদের আধ্যাত্মিকতা, মসজিদ আল মুস্তফার আধুনিকতা, ২০১ গম্বুজ মসজিদের বিশালতা কিংবা বেলাব বাজার মসজিদের ঐতিহাসিক মহিমা আপনার এবারের ঈদের গন্তব্য হতে পারে যেকোনোটি। এই মসজিদ ও ঈদগাহগুলো আমাদের দেশের আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশিল্পের একেকটি উজ্জ্বল স্মারক যা আপনার উৎসবের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

    শেয়ার করুন: