ঢাকার নগর পরিবহন
ফ্র্যাঞ্চাইজির দখল চান বাস মালিকরা
- কথা ছিল, সব বাস চলবে এক কোম্পানির ব্যানারে
- শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক-বেতন-কর্মঘণ্টা
- টিকিটের জন্য কাউন্টার, হবে না হুড়োহুড়ি
- বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি কোনো সরকারই

ছবিঃ আগামীর সময়
গল্পের শুরুটা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সময়। ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আর গণপরিবহনকে গণমানুষের বাহন করতে নেওয়া হয়েছিল বিশেষ পরিকল্পনা।
যেখানে বাসগুলো ব্যক্তিমালিকানায় থাকবে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের খেয়ালখুশিমতো সেগুলো চালাতে পারবেন না মালিকরা; বরং সব বাস চলবে এক কোম্পানির আওতায়। মোট আয় থেকে মালিকরা লভ্যাংশ আর শ্রমিকরা মাস শেষে পাবেন নির্দিষ্ট বেতন।
ভাবা হয়েছিল, রঙে, ধরনে, গড়নে সব বাস দেখতে একই হবে; থাকবে না অসুস্থ প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত জায়গায় থামবে, নিয়ম করে একই জায়গায় বাস পাবেন যাত্রীরা। বাসের পেছনে ছুটতে হবে না, থাকবে না হুড়োহুড়ি। এমনকি চালকের সহকারীকেও তুলতে হবে না ভাড়া। নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে উঠতে হবে।
স্বপ্নময় এ ধারণার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’। আর ব্যবসার আয় বণ্টনের ধরন ছিল ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ মডেলে। রেশনালাইজেশনের অধীনে ঢাকাকে ভাগ করা হয় ৪২টি পথে
এখানেই শেষ নয়। পরিকল্পনায় আরও ছিল পরিবহন শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, দিনে আট ঘণ্টা কাজ এবং মাস শেষে বেতনের নিশ্চয়তার বিষয়টিও।
স্বপ্নময় এ ধারণার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’। আর ব্যবসার আয় বণ্টনের ধরন ছিল ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ মডেলে। রেশনালাইজেশনের অধীনে ঢাকাকে ভাগ করা হয় ৪২টি পথে। বাস চলা শুরু হয় নগর পরিবহন নামের এক কোম্পানির অধীনে।
তারপর বুড়িগঙ্গার পচা পানি গড়িয়েছে বহু দূর; নষ্ট হয়েছে ধলেশ্বরীর মিষ্টি পানিও। পরিবহনব্যবস্থাও দূষিত করেছে ঢাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছিল কাজও। কিন্তু হয়নি ‘কাজের কাজ’ কিছুই।
মাত্র একটি রুটে একটি বাস কোম্পানি ছাড়া পাওয়া যায়নি কাউকে। মাঝপথে সরকারি সংস্থা বিআরটিসিকে নামানো হয়েছিল জোর করে। ১১ কোটি টাকা লোকসান গুনে উধাও তারাও।
এরই মধ্যে মারা গেছেন মেয়র আনিসুল হক; গণঅভ্যুত্থানে বিদায় নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লম্বা সময় দেশ পরিচালনা করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন ফের ক্ষমতায় জনগণের নির্বাচিত সরকার।
অনেক কিছুই হয়েছে, হচ্ছেও; শুধু বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন ছাড়া। যদিও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভাবনাটা এখনো জ্বলছে টিমটিম করে।
বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনায়ও রয়েছে এর রেশ। কিন্তু কেন যেন ব্যাটে-বলে মিলছে না, এগোচ্ছে না কিছুই।
এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি উদ্যোগে নিজেরাই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে বাস চালাতে চান পরিবহন মালিকরা।
তারা বলেছেন, প্রাথমিকভাবে বেছে নেবেন একটি নির্দিষ্ট পথ। সেটি গাজীপুর থেকে মতিঝিল হতে পারে। সেই রুটে আর অন্য কোনো বাস আলাদাভাবে চলতে পারবে না। সব মালিকের বাস একটি কোম্পানির আওতায় নেওয়া হবে।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের মডেলটিই বাস্তবায়ন করতে চান জানিয়ে দুটি শর্ত রেখেছেন মালিকরা।
‘কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অনেক কিছু মেনে করতে হয়। চাইলেই একটি চার্জিং স্টেশন করা যায় না। আমরা বেসরকারি উদ্যোগে করতে চাই। সরকার শুধু অনুমতি দিক। আমরা নতুন বিদ্যুৎচালিত বাসও আমদানি করতে চাই। সরকার শুধু ট্যাক্স মাফ করে দিক।’
প্রথমটি, বৈদ্যুতিক বাস আমদানির কর মওকুফ। চার্জিং স্টেশনসহ এসব বাস চালাতে যেসব স্থাপনা তৈরি করতে হবে, সেগুলোর সহজ অনুমোদন, দ্বিতীয় শর্ত।
কোনো সরকারই যেহেতু বাস রুট রেশনালাইজেশন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তাই এই দায়িত্ব এখন বাস মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম।
তার মতে, ‘কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অনেক কিছু মেনে করতে হয়। চাইলেই একটি চার্জিং স্টেশন করা যায় না। আমরা বেসরকারি উদ্যোগে করতে চাই। সরকার শুধু অনুমতি দিক। আমরা নতুন বিদ্যুৎচালিত বাসও আমদানি করতে চাই। সরকার শুধু ট্যাক্স মাফ করে দিক।’
মালিক সমিতির এই নতুন নেতার দাবি, একবার শুরু হলে বাকিগুলো ধীরে ধীরে হয়েই যাবে।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, ওই সময় এই পথে রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, মিডলাইন, সিটি লিংকসহ ১৩টি রুটের ৩৮২টি বাস চলত। সেসব বাস পরবর্তী এক মাস অর্থাৎ ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কথা ছিল সরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু আদতে তা করা যায়নি।
একই সময়ে নগর পরিবহনে বাসের পাশাপাশি চলেছে অন্য প্রতিষ্ঠানের বাসও। আর রেশনালাইজেশনের অধীনে নেওয়া গিয়েছিল শুধু ট্রান্সসিলভা নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাসকে। পরে অবশ্য টানা লোকসানের মুখে তারাও সরিয়ে নেয় নিজেদের।
এরপরও কিছুদিন এই সেবা চালু রাখা হয় বিআরটিসির বাস দিয়ে। বিআরটিসির এক কর্মকর্তা বলেছেন, শুরু থেকেই লোকসান গুনতে হয়েছিল। নগর পরিবহনের রুটে অন্য বাস চললে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রী পাওয়ার পথ হয় কঠিন। তাই পরিকল্পনামতো বাস চালানো সম্ভব হয়নি।
সরকারি উদ্যোগে মালিকরা কেন বাস চালাতে নারাজ
নগর পরিবহনের অসফলতার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে বেসরকারি পরিবহন মালিকদের অসহযোগিতার বিষয়টি।
মালিকদের বরাবরের সন্দেহ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে এলে তারা বঞ্চিত হবেন মূল মুনাফা থেকে।
‘দিন শেষে সরকারে যে দল থাকে, ওই দলের মতাদর্শী লোকরাই পরিবহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠনের বড় পদে বসেন। সরকারকে দলের রাজনীতির সে সুযোগ কাজে লাগাতে হবে’
কিন্তু পরিবহন ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, চাঁদাবাজির সুযোগ না থাকা, হুটহাট কর্মবিরতির নামে সরকারকে চাপে ফেলার সুযোগও যে হাতছাড়া হবে; সে কথা প্রকাশ্যে না বললেও আড়ালে-আবডালে বললেন। আর নিজেদের মধ্যে এটি প্রকাশ্য বিষয়।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মনে করছেন, স্বার্থের জলাঞ্জলি দিয়ে কেউ এই পরিকল্পনা সফল করতে এগিয়ে আসবে না। ‘অনেকের অনেক স্বার্থ ছিল, আছে এখনো। সরকার পরিবর্তন হলেও হয়নি স্বার্থের পরিবর্তন। স্বার্থের জলাঞ্জলি দিয়ে তারা কেউ এটি সফল করবে না।’
পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা বিষয়টি তুলে ধরলেন ভিন্ন আঙ্গিকে। আয় বণ্টনের হিসাবের ধারণা নিয়ে সন্তুষ্ট নন তারা। ‘আমরা বলেছি, যেসব বাসের আয়ুষ্কাল আছে, সেগুলো বাদ দেওয়া যাবে না। বাস মেরামতের দায়িত্ব আমাদের। তবে ট্রিপভিত্তিক আয়ের বণ্টন করতে হবে। কেউ কম ট্রিপ দেবে, কেউ বেশি; এরপরও সবার আয় সমান হতে পারে না।’
আরেক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, রুট রেশনালাইজেশন সফল করতে হলে আরও কঠোর হতে হবে সরকারকে। বাড়াতে হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ‘দিন শেষে সরকারে যে দল থাকে, ওই দলের মতাদর্শী লোকরাই পরিবহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠনের বড় পদে বসেন। সরকারকে দলের রাজনীতির সে সুযোগ কাজে লাগাতে হবে’, যোগ করলেন তিনি। দু-একটি রুট জনপ্রিয় করা গেলে বাকিগুলো খুব সহজে হয়ে যাবে বলেও মত দেন।



