দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে ইরান যুদ্ধ, বাজার গনগনে
- সোয়া ৩ কোটির বেশি মানুষকে ঠেলে দিতে পারে দারিদ্র্যের কবলে
- সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো, বলছে ইউএনডিপি
- জ্বালানি, খাদ্য এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ত্রিমুখী ধাক্কার শঙ্কা
- ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ

বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে রয়ে যাবে এই সংঘাতের ‘ক্ষতচিহ্ন’। ছবি : দ্য গার্ডিয়ান
ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪১০ থেকে ৪৩০ টাকায়। এক মাসের আগের দামের চেয়ে যা অন্তত দেড়শ টাকা বেশি। বাজার পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, মুরগি তো বটেই মৌসুমি সবজিও যেন হয়ে উঠেছে ‘বড়লোকের খাবার’।
সোমবার সকালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে কথা হচ্ছিল রিকশাচালক বাসেত মিয়ার সঙ্গে। নিত্যপণ্যের বাজারদর দেখে ভীষণ আতঙ্কিত তিনি। প্রশ্ন করেছিলাম, কেন সবকিছুর দাম বাড়ছে জানেন?
ক্ষুব্ধস্বরে বাসেত বললেন, ‘কোথায় বুলে যুদ্ধ হচ্ছে! হামরা গরিব মানুষ কী যুদ্ধ বুঝি? ভোট দিছু, এলা কর্ম করে খাবার চাই। সারা দিন রিশকা চালায়ে যদি বাজারই না করবা পারি তালে কী খায়া বাঁচমু?’
দারিদ্র্য বিমোচনে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজনে বিনিয়োগ করা হলে তা বিশ্বকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করে। আর সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে পৃথিবী আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে
ইরান থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। ছয় সপ্তাহ আগে দেশটিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের রেশ ধরে এই দূরদেশের বাজারেও আগুন। এমন যখন বাস্তবতা, তখন আরও খারাপ খবর দিল জাতিসংঘ। আর সেটি হলো, চলমান ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ পড়তে পারে দারিদ্র্যের কবলে। যার মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ইউএনডিপির ধারণা।
যুদ্ধে এখন চলছে বিরতি, যদিও এই বিরতি নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের সংশয়। আর সেই সংশয়ের মধ্যেই জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে উঠে এলো এই নতুন তথ্য। ইউএনডিপি বলছে, জ্বালানি, খাদ্য এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি— এই ত্রিমুখী ধাক্কার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্ব।
ধনী দেশগুলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, দক্ষিণের দেশগুলোর অবস্থান শুরু থেকেই দুর্বল ছিল
ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন থেকে সৃষ্ট যুদ্ধের কারণে বিশ্ব এখন যেসব পরিস্থিতি দেখছে, তার কথা ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখ রাত পর্যন্তও ভাবেনি কেউ। ইউএনডিপি মনে করছে, চলমান সংঘাত উল্টে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক উন্নয়নের অর্জনগুলো। যার প্রভাব বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই পড়বে। হয়তো সব জায়গায় সমান প্রভাব দেখা দেবে না, কিন্তু দেখা দেবেই।
এমনকি এ মুহূর্তে যুদ্ধ যদি থেমেও যায়, তবু এর যে প্রভাব এরই মধ্যে পড়ে গেছে, এর জের বিশ্বকে সামাল দিতেই হবে বলে সতর্ক করলেন ইউএনডিপির প্রশাসক এবং বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু। ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলছিলেন, ‘এই ধরনের সংঘাত মানেই বিপরীতমুখী উন্নয়ন। এমনকি যদি যুদ্ধ থেমেও যায়— তবু মনে রাখতে হবে, এরই মধ্যে পড়ে গেছে এর প্রভাব।’
দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষ যেন এই ধাক্কা সামাল দিতে পারেন, সেজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দিতে হবে অর্থ সহায়তা। যার ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার
‘আপনি এর একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব দেখতে পাবেন, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোয়, যেখানে আপনি মানুষকে আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এটাই সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়। যারা দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছেন, তারা আগেও দরিদ্রই ছিলেন। হয়তো কিছু সময়ের জন্য সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, যুদ্ধ আবার তাদের পিছিয়ে আগের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে’, যোগ করলেন তিনি।
আলেকডান্ডার ডি ক্রুর সঙ্গে মিলে যায় ঢাকার রিকশাচালক বাসেত মিয়ার কথাও। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় এসে অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারে সচ্ছলতা আনতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু গত এক মাসের পরিস্থিতি দেখে ঢাকায় টিকে থাকা নিয়েই সংশয়ে পড়ে গিয়েছেন, বলছিলেন বাসেত।
তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি প্রথম বিমান হামলার পর পেরিয়েছে ছয় সপ্তাহ। এ সময়ের মধ্যে জ্বালানির দাম ছুঁয়েছে আকাশ। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বে তেল-গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়েছে বাধা। শুধু কি তেল-গ্যাস? সার থেকে শুরু করে কোন প্রয়োজনীয় পণ্যটিকে হরমুজ পার হতে হয় না? এই প্রভাব এতটাই গুরুতর যে, বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য তৈরি হয়েছে এক ধরনের খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক ‘টাইম বোমা’।
প্রয়োজনে বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাসের জন্য দেওয়া যেতে পারে সাময়িক ভর্তুকিও। তবে এ ক্ষেত্রে ঢালাও ভর্তুকির পক্ষেও নয় ইউএনডিপি। এতে তুলনামূলক ধনী পরিবারগুলো এই সুবিধা পেতে পারে এবং তাহলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না এ সহায়তা
মধ্যপ্রাচ্যে যদি স্থিতিশীল পরিস্থিতিও তৈরি হয়, তবু মনে করা হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে রয়ে যাবে এই সংঘাতের ‘ক্ষতচিহ্ন’। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য বিশ্বনেতাদের একমত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইউএনডিপি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষ যেন এই ধাক্কা সামাল দিতে পারেন, সেজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দিতে হবে অর্থ সহায়তা। যার ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন ব্যাংকগুলো এই সহায়তা দিতে পারে জানিয়ে আলেকডান্ডার ডি ক্রুর বললেন, প্রয়োজনে বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাসের জন্য দেওয়া যেতে পারে সাময়িক ভর্তুকিও। তবে এ ক্ষেত্রে ঢালাও ভর্তুকির পক্ষেও নয় ইউএনডিপি। এতে তুলনামূলক ধনী পরিবারগুলো এই সুবিধা পেতে পারে এবং তাহলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না এ সহায়তা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল ও গ্যাস খাতে ছয় সপ্তাহের যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, এর জেরে আগামী প্রায় ৮ মাস অব্যাহত থাকবে উচ্চমূল্য। যার প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে দারিদ্র্যের শিকার হবে ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ। আর ইউএনডিপির প্রতিবেদন বলছে, দারিদ্র্য বৃদ্ধির অর্ধেকই হবে নেট জ্বালানি আমদানিকারক ৩৭টি দেশের মধ্যে। যার মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ছোট কিছু দ্বীপরাষ্ট্র।
ধনী দেশগুলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, দক্ষিণের দেশগুলোর অবস্থান শুরু থেকেই দুর্বল ছিল বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এমন এক সময়ে এ খবর এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা সরকারগুলো ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং প্রতিরক্ষাব্যয় বৃদ্ধির চাপে তাদের উন্নয়নশীল দেশের জন্য কমাচ্ছে সহায়তা বাজেট। অথচ এখনই সহায়তা দেওয়ার উপযুক্ত সময়।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে সহায়তা কমে যাওয়ার চিত্র। সেখানে দেখা গেছে, উন্নয়ন সহায়তা কমিটির দেশগুলো ২০২৫ সালে সহায়তা ব্যয় কমিয়েছে ১৭৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার নেতিবাচক ফল বেশ দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে আশঙ্কার কথাও জানালেন ডি ক্রু। কেননা, দারিদ্র্য বিমোচনে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজনে বিনিয়োগ করা হলে তা বিশ্বকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করে। আর সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে পৃথিবী আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে, আরও বেশি মানুষকে দারিদ্র্যসহ নানা সমস্যার সঙ্গে শুধু করেই যেতে হবে লড়াই।




