উদ্বোধন মঙ্গলবার
ফ্যামিলি কার্ড পেলে ছাড়তে হবে টিসিবি কার্ডসহ ৩ সুবিধা

সংগৃহীত ছবি
সরকারের 'ফ্যামিলি কার্ড' পেলে ছাড়তে হবে 'টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি' কার্ডসহ তিন ধরনের সুবিধা। অন্যগুলো হলো খাদ্য মন্ত্রণালয়ের 'খাদ্যবান্ধব' এবং 'ভালনারেবল উইম্যান বেনিফিট (ভিডবিউবি)' কর্মসূচি সুবিধা।
মূলত দুঃস্থ নারীদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে ভিডবিউবি কর্মসূচি, যা পরিচালনা করছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এছাড়া পরিবারের প্রধান নারী হলে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের বাইরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্য কোনো কার্ডের সুবিধাভোগ করতে পারবেন না। তবে যে পরিবারের প্রধান নারী নয়, সে পরিবারের অন্য সদস্যরা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পেয়ে থাকবেন বলে জানিয়েছে সংশিষ্ট সূত্র।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ১০টায় রাজধানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। একই সময়ে দেশের আরও ১৪টি স্থানে এ কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করা হবে।
প্রসঙ্গত, বিএনপি সরকারের নির্বাচনের ইশতেহারে ঘোষণা ছিল দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে কার্ড বিতরণের নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে।
সেই লক্ষ্যে দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আলোকে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে যার নামকরণ হচ্ছে 'ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬'। এ কর্মসূচির মূল দর্শন ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।
দারিদ্র বিমোচনের জন্য এ কার্ড চালু হচ্ছে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, দীর্ঘ অর্থনৈতিক সঙ্কট ও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষগুলো চরম মানবেতর জীবনজাপন করছেন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে মোট জনসংখ্যার ৩ কোটি ২০ লাখ দরিদ্র এবং অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৯৫ লাখ।
অপরদিকে, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) হিসাবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি এবং অতিদরিদ্রের সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি। বিদ্যমান যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তা দিয়ে সব গরীব মানুষকে সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে এ পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ড দারিদ্র বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যে কারণে ভূমিহীন ও গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যকে পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠী-হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবার এবং দশমিক ৫ একর বা এর নিচে কম জমির মালিকও পাবেন এ কার্ড।
ফ্যামিলি কার্ডের চ্যালেঞ্জ
গরীব ও হতদরিদ্র মানুষকে সহায়তার লক্ষ্যে দেশে ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির চলছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। দেখা গেছে, একাধিক কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করছেন এক ব্যক্তি। পাশাপাশি প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচির সুবিধা পৌঁছছে না।
সরকারের এক হিসাবে নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা থেকে প্রায় ২২-২৫ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাদ পড়ছেন। এছাড়া টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বা অন্যান্য কার্ড বিছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় সরকারি সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পরিচালনা করা হবে ফ্যামিলি কার্ড।
যেসব সুবিধা থাকছে কার্ডে
এ কার্ডের আওতায় প্রত্যেক পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
এছাড়া সব ধরনের নগদ সহায়তা ও বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের 'ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি' স্থানান্তরিত করা হবে। একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলো। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই ভাতাটি সরাসরি পরিবারের 'মা' বা 'নারী প্রধান' সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে।
জুনের মধ্যে ৪০ হাজার কার্ড প্রদান
পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ কর্মসূচি চালু হবে। এ প্রকল্পে ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আগামী জুনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৪০ হাজার অভাবী পরিবারের কাছে কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
চলতি মাসে প্রথম পর্যায়ে ১০ হাজার সুবিধাভোগী পাবেন এ কার্ড। দ্বিতীয় পর্যায়ে এপ্রিলে ১০ হাজার, মে মাসে ১০ হাজার এবং জুনে ১০ হাজার কার্ড দেওয়া হবে প্রকৃতভোগীদের। তবে পর্যায়ক্রমে দেশের ২ কোটি পরিবার পাবেন ফ্যামিলি কার্ড।
পাইলটিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রয়োজন হবে। যার ৬৬ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছাবে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে অর্থের প্রয়োজন, সেটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের অপ্রতাশিত খাত এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে দেওয়া হবে। অবশ্য চার হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ আছে অপ্রত্যাশিত খাতে।
পাইলট প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না যারা
কোনো নারীর ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে তিনি এ কার্ডের সুবিধা পাবেন না। এছাড়া পরিবারের কেউ সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী থাকলে এ সুবিধার বাইরে থাকবে। এছাড়া, এসি ব্যবহারকারী বা গাড়িসহ বিলাসবহুল সম্পদ, বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও বড় ব্যবসার মালিক হলে নগদ সহায়তার প্রাপ্যতা বর্হিভূত হিসেবে বিবেচিত হবেন।
কর্মসূচির লক্ষ্য
একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি 'সবজনীন সোশ্যাল আইডি-কার্ডে’ রূপান্তর করা। আর ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করা। ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক সনদ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করবে।
যেসব স্থানে কার্যক্রম শুরু হবে
পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দেশের ১৪টি ভিন্নধর্মী এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি (শহরে বস্তি), মিরপুর অলিমিয়ারটেক বস্তি ও বাগানবাড়ি বস্তি (শহুরে বস্তি)।
এছাড়া চট্টগ্রামের পটিয়া (শিল্প এলাকা), বান্দরবানের লামা (পার্বত্য এলাকা), সুনামগঞ্জের দিরাই (হাওর এলাকা) এবং ঠাকুরগাঁও সদর (সীমান্তবর্তী এলাকা) মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনুগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

