অভ্যুত্থানের পর দেড় বছর কোথায় ছিলেন শিরীন শারমিন?

ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর পাঠানো হয়েছে কারাগারে। মঙ্গলবার দুপুরে তাকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করে দুই দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। সেটি নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেড় বছরেরও বেশি সময় আত্মগোপনে ছিলেন টানা তিনবারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঢাকা ও রংপুরে জুলাইয়ের একাধিক হত্যা মামলায় তার নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ‘এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার লালবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তাকে,’ বলছিলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ২৭ দিনের মাথায় স্পিকার পদ থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী সরে দাঁড়ানোর তথ্য জানিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর গত দেড় বছরে প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি তাকে। এই সময়ে নানান গুঞ্জন শোনা গেছে তার অবস্থান নিয়ে।
দেড় বছর কোথায় ছিলেন শিরীন শারমিন?
গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান আওয়ামী লীগের নেতারা। গ্রেপ্তারও হন অনেকেই।
জনরোষে প্রাণহানির আশঙ্কায় সেসময় বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন কেউ কেউ। তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
‘মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে ও আইন-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে জীবন রক্ষা করতেই’ তাদের সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয় আইএসপিআরের বিবৃতিতে।
প্রাথমিকভাবে সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও বছরখানেকের মাথায় গত বছরের ২২ মে প্রকাশ করা হয় সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের তালিকা। সেই তালিকায় ছিল সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম। সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে থাকতে পারেন শিরীন শারমিন।
কীভাবে তিনি সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, সেটির একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি জবানবন্দিতে। গত বছরের এপ্রিলে পলক আদালতকে জানিয়েছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন লুকিয়ে ছিলেন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান সেনা সদস্যরা।
এর কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন পলক। কিন্তু তখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি শিরীন শারমিন চৌধুরীর। তিনি কতদিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি আইএসপিআরের পক্ষ থেকে।
যেভাবে গ্রেপ্তার
প্রায় দেড় বছর পর ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে’ মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার নিজ বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন যে, সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর দেশের ভেতরেই বিভিন্ন জায়গায় ‘আত্মগোপনে ছিলেন’ শিরীন শারমিন চৌধুরী।
‘উনি বলছেন যে, এতদিন দেশেই ছিলেন। যে বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটা তার স্বামীর নামে। ধরা পড়ার আগে তিনি কোথায় কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে এ বিষয়ে,’ বলেছিলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম।
যত মামলা
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ অন্তত অর্ধডজন মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর। এর মধ্যে একটি রংপুরের শ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা। এজাহারের তথ্য থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় নিহত হন তিনি। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী দিলরুবা আকতার। সেখানে শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ আসামি করা হয়েছে ১৭ জনকে।
ঢাকার লালবাগ থানায়ও জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলায় আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রাথমিকভাবে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়েছে তাকে। তবে অন্য মামলাগুলোতেও পর্যায়ক্রমে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরপর মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। নবম সংসদের শেষদিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেসময়ের স্পিকার আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতি বানায় আওয়ামী লীগ সরকার।
এরপর ২০১৩ সালে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।



