কেমন ছিল সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন?

রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই উদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণে টেবিল চাপড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা। অন্যদিকে তার ভাষণের সময় স্লোগানের মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে বিরোধীদলীয় এমপিদের।
এক কথায় বলা যায়, তীব্র প্রতিবাদ, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন এবং বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় স্পিকারের চেয়ার শূন্য রেখেই কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত এই সংসদ অধিবেশন।
পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে সংসদের প্রথম বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়।
সংসদের কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন নেত্রকোনা-১ আসনের ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বর্তমান সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরে দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান নতুন স্পিকার।
এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথের জন্য জাতীয় সংসদের বৈঠক আধা ঘণ্টা মুলতবি করা হয়।
এর আগে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে প্রথম বৈঠকের সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ওই প্রস্তাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সমর্থন জানান।
রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেওয়ার পর অধিবেশনের দুপুরের সেশনের শুরুতেই স্পিকারের হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমরে পক্ষ থেকে এই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশি নেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সংসদ।
পরে শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় শরীফ ওসমান হাদী, আবরার ফাহাদ এবং ফেলানী খাতুনের নামও।
দুপুরের বিরতি শেষে কার্যসূচির ধারাবাহিকতায় উত্থাপন হয় শোক প্রস্তাব, যা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়।
গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের নাম শোকপ্রস্তাবে উত্থাপন করেন স্পিকার। এ সময় সরকারি ও বিরোধীদল উভয় পক্ষ থেকে আরও বেশকিছু নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠে।
নতুন প্রস্তাবিত নাম বিবেচনার কথা জানিয়ে শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু হয়। সরকার দলীয় সংসদসদস্য ও মন্ত্রীরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে।
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য উত্থাপিত নামগুলোর স্বপক্ষে বক্তব্য উঠে আসে। পরে শোকপ্রস্তাবে উল্লেখিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং আত্মার শান্তি কামনায় করা হয় মোনাজাত।
এরপর অধিবেশনের সূচি অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের (২) দফা মোতাবেক এই অধ্যাদেশগুলো অধিবেশনে পেশ করবেন।
তারপর অধিবেশনের বিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে আহ্বান জানান স্পিকার। এরপরই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ শুরু করেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল— ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘গণতন্ত্র চাই, ফ্যাসিজম নয়’ এবং ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ করো’।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার শান্ত থাকার অনুরোধ জানালেও বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি ও ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন ১১ দলীয় জোটের এমপিরা।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বক্তব্য শুরু করলে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের পাশাপাশি স্লোগান দিতে থাকেন বিরোধীরা। রাষ্ট্রপ্রধানের ভাষণের দুয়েক মিনিটের মাথায় ওয়াক আউট করে তারা। এর মধ্য দিয়ে সংসদের প্রথম দিনেই ওয়াক আউটের ঘটনা ঘটলো।
এদিকে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার লিখিত ভাষণ পাঠ করেন। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার দল বিএনপি এবং মিত্রদের অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে তিনি একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে তাদেরও শুভেচ্ছা জানান। সরকারি বেঞ্চের সদস্যদের বিপুল উৎসাহে টেবিল চাপড়াতে দেখা যায় রাষ্ট্রপতির বক্তব্য চলাকালে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হওয়ার পর আগামী রবিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত সংসদ মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এর মধ্যে দিয়েই শেষ হয় প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিন। এখন দেখার বিষয় অধিবেশনের বাকী দিনগুলোতে সংসদের পরিবেশ কেমন থাকবে?

