আগামীর সময়

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জটিলতা চরমে

  • জুলাই আদেশ অনুযায়ী সময় শেষ
  • সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের বিতর্ক
  • আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জটিলতা চরমে

ছবিঃ আগামীর সময়

জুলাই সনদ, গণভোট বাস্তবায়ন ও জুলাই সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংকট যেন কাটছেই না। জুলাই সনদ অনুযায়ী গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ একইদিনে হওয়ার কথা। সেদিন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও আইনিভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকে দলটি । সেই থেকে সংকট ও বিতর্ক। তবে এবার সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েই তৈরি হয়েছে চরম জটিলতা।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। এই আদেশ ও জুলাই সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদের।

জুলাই আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়, একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার বিধান রাখা হয়েছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর নির্বাচনী ফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের শেষ সময় ছিল আজ রবিবার। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও সেই অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে।

এতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এ নিয়ে বিতর্ক করেন সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে জামায়াত ও এনসিপি একাট্টা অবস্থানে থাকলেও বিএনপি সংবিধানের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি সামনে এনেছে। সরকার বলেছে, এ ধরনের কোনো পরিষদ করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। দলটির নেতারা বলছেন, সংবিধানে নির্ধারিত সময় ও পদ্ধতি অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা মনে করছেন, জুলাই আদেশের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা। সেই সংস্কারের পক্ষে গণভোটে জনগণ রায় দিলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার সেটি বাস্তবায়ন করছে না।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনের হুমকিও দিয়ে রেখেছে তারা। একইসঙ্গে সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা বলেও মন্তব্য তাদের।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সমাধানযোগ্য। সরকারি দল ও বিরোধীদল আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য পথ বের করতে পারে। সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক— দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে।

‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিবেশন আহ্বান না হওয়ায় একটি প্রক্রিয়াগত জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এটি অমীমাংসিত কোনো সংকট নয়। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা সম্ভব’, আগামীর সময়কে বলছিলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুল হক।

সংসদে বিতর্ক

জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নেই সংবিধানে। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে তা করেননি। বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।

এদিন বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা পড়ে শোনান তিনি।

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫। এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে। যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন’, ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি।

এবারের সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটি ‘ক্যাপাসিটিতে’ নির্বাচিত হয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান মন্তব্য করেন, ‘জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ আদেশ অনুসারে তারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান।’

তার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।

এরপর জবাব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ‘অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে এমন কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নয়। কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস। সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউটার জেন্ডার হতে পারে’, বলছিলেন তিনি।

আদেশটি ‘আরোপিত’ উল্লেখ করে তার ভাষ্য, ‘সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ বাদে সবগুলো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। একইভাবে এই সংসদের আহ্বানও তিনি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব সংবিধানে না থাকায় রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না।’

অধিবেশন শেষ হওয়ার পরও বিতর্কের রেশ থাকে। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করছেন।

নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি সংসদে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধী দলীয় নেতা এই প্রসঙ্গটি আজ অধিবেশনে উত্থাপন করলেও তাকে যথাযথ আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করতে পারেন না এবং এটি অসাংবিধানিক বলা সমীচীন নয়। সরকার যদি গণভোটের ফল মেনে নেয় তবে জুলাই সনদের আদেশও মানতে হবে। গণভোটের বিষয়ে সরকারি দলের সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ তার।

আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধী দল। শনিবার জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের জানান, ১৫ মার্চ সরকারের ৩০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলে তারা জাতির কাছে ক্ষমা পাবে না। সংসদ নেতাসহ সরকারকেই এর দায় নিতে হবে।

‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। শিগগিরই শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন’, জানাচ্ছিলেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক।

তার দাবি, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে, দুটি অধিবেশন ডাকার কথা। কিন্তু অধিবেশন ডাকা হয়েছে শুধু জাতীয় সংসদের। বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তে সংসদ সদস্যের শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এতে বোঝা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের আগের অবস্থান থেকে ইউটার্ন নিয়েছে। এর মাধ্যমে জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিয়েছে, তাদের অপমান করা হয়েছে।

‘আমরা ১১ দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি নেওয়ার কথা ভাবছি। আমরা মনে করছি বিএনপি সংস্কার ও জুলাই সনদ এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সুযোগ আমরা দিব না। যেকোনো মূল্যে গণভোট বাস্তবায়ন হতে হবে। এজন্য আলোচনা, রাজপথ, আদালত কিংবা গণআন্দোলন সবকিছুই বিবেচনায় নিচ্ছি’, আগামীর সময়কে বলছিলেন এনসিপির শীর্ষ এক নেতা।

    শেয়ার করুন: