আগামীর সময়

পড়া মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন আনে

পড়া মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন আনে

পড়া বা পাঠ করা আমাদের মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন ঘটায়? বর্তমান যুগে আমরা মনে করি লেখা একটি সরল এবং প্রাকৃতিক ব্যাপার। এজন্য পড়াও সাধারণ ও পুরনো ব্যাপার। কিন্তু আদতে তা নয়। আমাদের মস্তিষ্কের যে নিউরো টিপিক্যাল সার্কিট্রি আছে, তা আমাদের চোখকে দেখতে এবং ভোকাল কর্ডকে শব্দ তৈরি করতে সাহায্য করে।

শুরুর দিকে লিখিত অক্ষর পড়ার সামর্থ্য আমাদের ব্রেইনের ছিল না। এই কর্মদক্ষতা হাজার বছর ধরে বিকশিত হতে হতে আজকের জায়গায় এসে পৌঁছেছে।

৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বের প্রাচীন সুমেরিয়ান কুনেফর্ম লিপিকে পৃথিবীর ‘প্রথম লিখিত লিপি’ মনে করা হয়ে থাকে। প্রায় একই সময়ে মিশরীয়রা তাদের হায়রোগ্লিফিক লিপির ব্যবহারও শুরু করে। তখন থেকেই ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে পাঠ করার ক্ষমতার বিকাশ হতে শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন আমরা যখনই পড়তে শুরু করি, সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্ক স্নায়ুতন্ত্রের দেখার এবং শোনার ক্ষমতা একসাথে সংযুক্ত করে ফেলে।

সুতরাং পড়ার সময় আমাদের পুরো মস্তিষ্ক একসাথে কাজ করে। কর্টেক্সের চারটি ল্যুব একসাথে সক্রিয় হয়। কিন্তু পাঠ করার ধরণের মাঝেও আছে পার্থক্য। একেক ভাষার বর্ণ এবং চিহ্ন একেক রকম হয়ে থাকে। ভিন্ন ভাষার চিহ্ন বা বর্ণ আমাদের মস্তিষ্কে একেক রকম প্রভাব ফেলে।

উদাহরণস্বরূপ, চীনের ভাষায় অক্ষরের পরিবর্তে লগোগ্রাফিক চিহ্নের ব্যবহার হয়ে থাকে। কোনো বস্তু বা ধারণা লিখিত আকারে প্রকাশ করতে গেলে তারা অক্ষর ব্যবহার না করে চিহ্ন বা প্রতীকের ব্যবহার করে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, চিহ্ন নির্ভর ভাষা আর অক্ষর নির্ভর ভাষা (যেমন বাংলা, ইংরেজি) পড়ার সময় মস্তিষ্কের দুটি আলাদা ভাগ আলাদা ভাবে কাজ করে থাকে।

এমন একজন রোগী, যিনি ইংরেজি এবং চাইনিজ, দুই ভাষাই জানেন তাকে নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, ব্রেইন-স্ট্রোকের ফলে ঐ ব্যক্তির মস্তিষ্কের কিছু অংশ কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ায় তিনি চাইনিজ ভাষা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলেন। পড়তে পারছিলেন না। অথচ ইংরেজি ভাষা ঠিকই পড়তে ও ব্যবহার করতে পারছিলেন।

আরেকটি মজার বিষয় হলো, আমরা মনে করি কোনোকিছু পড়া কেবল আমাদের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। তেমনটি নয়। কোনো কিছু পড়ার সময় সেই অনুভূতি আমাদের পাচনতন্ত্রেও প্রভাব ফেলে। আমরা কোনো কিছু পড়ার সময় আমাদের পেটে সেই স্নায়ুচাপ, পেটে ব্যথা, বমি ভাব অনুভব করতে পারি। কোনো কিছু পড়ে উৎফুল্লের অনুভূতি হলে মনে হয় যেন পেটে প্রজাপতি উড়ছে।

আমাদের মস্তিষ্ক খুব তাড়াতাড়ি নতুনত্ব গ্রহণ করে নিতে চেষ্টা করে। যেমন বর্তমান যুগে নতুন প্রযুক্তির কারণে পড়ার ধরণ অনেকটা বদলে গেছে। আমাদের মস্তিষ্ক সেই পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফোন বা ট্যাবলয়েডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রোল করার সময়ও আমরা অনেক কিছু পড়ি। আমাদের মস্তিষ্ক ইতিমধ্যে জানে, এখানে অনেক স্প্যাম, ভুল তথ্য থাকতে পারে। পড়ার সময় নোটিফিকেশন অথবা ফোন কল আসতে পারে, চার্জ চলে যেতে পারে।

সেজন্য গ্যাজেটে কোনোকিছু পড়া আমাদের মস্তিষ্ক প্যাসিব রিডিং হিসেবে ধরে নেয়। অপরদিকে কাগজের বই পড়া মস্তিষ্ক অ্যাক্টিভ রিডিং হিসেবে ধরে নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা যখন কাগজের লেখা পড়ি, আমাদের মস্তিষ্কের পাঠ করার কর্টেক্স তখন সবচেয়ে বেশি সচল থাকে।

আমাদের স্নায়ু গ্যাজেট স্ক্রোল করার সময় দ্রুত এক তথ্য থেকে অন্য তথ্যে যাওয়ার জন্য চঞ্চল হয়ে পড়ে। কোনো লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়ার পরিবর্তে আমরা স্ক্যাম রিড করি। অপরদিকে বই পড়ার সময় আমদের মস্তিষ্ক কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীরে গিয়ে ভাবার মতো পর্যাপ্ত সময় পায়। সেজন্য হাতে নিয়ে কাগজের বই পড়া, গ্যাজেট থেকে কোনোকিছু পড়ার চাইতে বেশি উপকারী।

গবেষণা মোতাবেক, যেসব ছাত্রছাত্রী ছোটবেলা থেকেই ফোন চালানো শুরু করেছে, তাদের তুলনায় যারা দেরিতে ফোন ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছে, সেই বাচ্চারা কাজে বেশি মনোযোগী হয়। নতুন কিছু শিখতে তারা বেশি কৌতূহলী হয়ে থাকে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে গভীরে চিন্তা করার ক্ষমতাও তাদের বেশি থাকে।

টেকনোলজির সহজলভ্যতার কারণে শিশুরা এখন সবসমই গ্যাজেটের সান্নিধ্য পাচ্ছে। এক বিষয় নিয়ে জানার আগ্রহ জন্মানো এবং সে আগ্রহ পরিপূর্ণ হবার আগেই তারা অবচেতনে অন্য আরেকটি বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা শুরু করছে। আগ্রহের এইরকম উঠানামা হওয়ার কারণে তাদের দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছে।

আগ্রহ এবং চাহিদার পরিপূর্ণতা আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু শিশুর কোনো কৌতূহলই পরিপূর্ণ না হওয়াতে হরদম এই গ্যাজেট চালানোও তাদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেজাজ খিটখিটে করে তুলছে। শিশু মনস্তত্ত্ববিদেরা মনে করেন, এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে মা-বাবাকে এগিয়ে আসতে হবে। বাচ্চার সামনে নিজেদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাচ্চাদের বই পড়ে শোনাতে হবে। বই কেন্দ্র করে পারিবারিক আলোচনা তর্ক-বিতর্ক তৈরি করতে হবে। তবেই নতুন প্রজন্ম গ্যাজেটের ক্লান্তিকর দুনিয়ার বাইরে গিয়ে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পাবে।

    শেয়ার করুন: