ইরান যুদ্ধ কি তীব্র খাদ্য সংকট ডেকে আনছে?

সংগৃহীত ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ চলত। এখন খুব কম সংখ্যক জাহাজ এ পথে চলে। কারণ প্রণালীটি বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাইন বসিয়েছে তেহরান। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী কয়েক মাস পথটি বন্ধ থাকতে পারে।
যদিও হরমুজ প্রণালী জ্বালানি পরিবহনের জন্য বিখ্যাত তবে এর প্রভাব জ্বালানি বাজারে নয়, বরং খাবারের টেবিলে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ তেলের জাহাজের পাশাপশি এ পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্য আনা-নেওয়া করা হয়। গম, ভুট্টা, চাল, সয়াবিন, চিনি এবং পশুখাদ্যের মতো অনেক খাদ্যপণ্য এ পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে যায়। একই সঙ্গে বিশ্বের কৃষকরা যে সার ও জ্বালানি ব্যবহার করেন, তার বড় অংশও এ পথ দিয়ে আসে।
খাদ্য আমদানি নির্ভর উপসাগরীয় দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে আছে। গম, চাল, পশুখাদ্য ও ভোজ্য তেলের জন্য তাদের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর নির্ভর করতে হয়।
করোনা মহামারির সময় পণ্য আনা-নেওয়ার ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে শুধু যুদ্ধকালীন নয় যে কোনো দুর্যোগের সময়ই সমস্যা তৈরি করে। ঘটনার পর থেকে অনেক উপসাগরীয় দেশই খাদ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। যেমন খাদ্যের মজুত বাড়ানো ও দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ করা। তারা বিকল্প পরিবহন পথও খুঁজছে। যেমন কিছু পণ্য হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে অন্য বন্দরের মাধ্যমে আনা হচ্ছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক পোর্ট অন্যতম।
এতে কিছুটা বিকল্প তৈরি হলেও হরমুজ প্রণাী বন্ধ হলে পরিস্থিতি সার্বিক পরিস্থিতি সামলানোর মতো যথেষ্ট না। কারণ বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইরাকের বাসিন্দারে মোট খাবারের প্রায় ৭০ শতাংশ এ পথে আসে। প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি মানুষের জন্য অন্তত ৮৭ হাজার টন খাদ্য এ অঞ্চলে সরবরাহ করতে হয়।
এ পথ বন্ধ হয়ে গেলে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তখন আকাশ পথে বিপুল পরিমাণ খাদ্য আনা-নেওয়া করতে হবে। তবে এতে ইরানও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপথে বাণিজ্য বন্ধ হলে একদিকে তাদের জ্বালানি রপ্তানি কমবে, অন্যদিকে গম, চাল, পশুখাদ্য ও ভোজ্য তেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে যাবে।
ইতিহাস বলছে, খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে বা খাদ্য সংকট দেখা দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। ২০০৮ সালে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়া, খারাপ আবহাওয়া এবং নীতিগত সমস্যার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং বহু দেশে খাদ্য দাঙ্গা শুরু হয়। পরে ২০১০-২০১১ সালে রাশিয়ায় ভয়াবহ খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে শস্য উৎপাদন কমে যায়, যার ফলে খাদ্যের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আরব বসন্ত আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়।
সম্প্রতি ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে বিশ্বজুড়ে শস্য, সার ও জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও খারাপ হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মহামারির প্রভাবের কারণে বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরাও সার ও জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। নাইট্রোজেন সার তৈরিতে প্রাকৃতিক গ্যাস লাগে, যা আধুনিক কৃষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বাণিজ্যিক নাইট্রোজেন সারের প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়।
যখন সার ও জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন কৃষকরা কম সার ব্যবহার করেন বা কম জমিতে চাষ করেন। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায় এবং এর প্রভাব পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচ গিয়ে সাধারণ মানুষের খাবারের বাজারদরে যোগ হয়।
খাদ্য, জ্বালানি ও সারের সরবরাহে সমস্যা হলে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে দাম বাড়তে পারে। কিন্তু আরেকটি জিনিস আছে যা কয়েক দিনের মধ্যেই সংকটে পড়তে পারে। সেটি হলো পানি।
বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে এমন আরেকটি বড় ধাক্কা এলে যাতে আরও কোটি কোটি মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে, সে জন্য এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

