আগামীর সময়

কিসের আশায় ইরান যুদ্ধ?

কিসের আশায় ইরান যুদ্ধ?

সংগৃহীত ছবি

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। কিন্তু ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ পাস হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধই এমন আইন লঙ্ঘন করেছে। কারণ এই সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষা বা কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩) এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের (১৯৯০-৯১) মতো নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া শক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ। বর্তমান ইরান যুদ্ধের বিশেষত্ব এর অবৈধতায় নয়, বরং এর কোনো স্পষ্ট বা অর্জনযোগ্য লক্ষ্য না থাকার মধ্যে।

মার্কিন কর্মকর্তারা কখনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন। আবার কখনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন এই অভিযান কেবল পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক-ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং তেহরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পক্ষ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জেদ ধরেছেন ইরানকে ‘গ্রহণযোগ্য’ নতুন নেতৃত্ব নিয়োগ করতে হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে যুদ্ধে নানাভাবে জিতে গেছে— এমন দাবিও করেছেন তিনি। যদিও ঠিক কীভাবে জিতে গেছে তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প স্পষ্টতই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত এড়াতে চান। কিন্তু এটি তার ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন শিবিরের সমর্থন কমিয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে তাকে জ্বালানি তেলের বাজারও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ইতিমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ২৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছে।

ইসরায়েলের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায় না। তারা তাদের সর্বাত্মক যুদ্ধ (টোটাল ওয়ার) কৌশলের অংশ হিসেবে ইরানের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এর মধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ তেহরানের জ্বালানি ডিপোও রয়েছে।

তবে মনে হচ্ছে, ইসরায়েলিদের তুলনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে মিত্রদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল ও ট্রাম্পের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধের ঝুঁকি টের পাচ্ছে।

হামলা শুরুর আগেই তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথ চালু রাখার চেষ্টা করেছিল। এটা যে ইরানের প্রতি তাদের সহানুভূতির জায়গা থেকে তা কিন্তু নয়। বরং জানত যে তেহরানের সবচেয়ে বেশি পাল্টা হামলার শিকার তারাই হবে।

এখন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও উপসাগরীয় তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশগুলোর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তাদের তেলনির্ভর অর্থনীতিকে ভিন্ন খাতে প্রশ্বস্ত করার ও অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক ব্যবসার নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা হুমকির মুখে। ইরান যদি তাদের তেলক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে বিশ্ব জ্বালানি বাজার আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

আরও বিশদভাবে বলতে গেলে, উপসাগরীয় দেশগুলো বোঝে যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যা এই যুদ্ধের মাধ্যমে না-ও হতে পারে। বরং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি সংঘাতকে আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল করতে পারে।

প্রাচীন সালামিসের যুদ্ধে (৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পারস্যদের পরাজিত করার পর এথেন্সবাসী পূর্ণ বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য না করার মাধ্যমে যে প্রজ্ঞা দেখিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত একটি কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুলে দিয়েছিল।

বিপরীতে ঐতিহাসিক ইয়ান কারশ যেমন দেখিয়েছেন— নাৎসি জার্মানির প্রতি মিত্রশক্তির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি সম্ভবত হিটলারের বাহিনীকে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে প্ররোচিত করেছিল।

ইরানও আজ একই ধরনের জেদ দেখাচ্ছে। তারা কেবল আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির মতো আরেকজন কট্টরপন্থীকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচনই করেনি; বরং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সেই ঘোষণা বাতিল করে দিয়েছে যাতে বলা হয়েছিল ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করবে।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের জন্য এই যুদ্ধ অস্তিত্বের লড়াই, তাই তারা তাদের হাতে থাকা প্রতিটি হাতিয়ার ব্যবহার করছে। জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পাশাপাশি তারা কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের (ইরানের নিজস্ব রপ্তানিসহ) একমাত্র নৌপথ।

তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা ও তুরস্কের আকাশসীমায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা তারই প্রমাণ। যেহেতু ইরানের কাছে প্রায় এক হাজার পাউন্ড ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, তাই পারমাণবিক ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।

যদি শেষ পর্যন্ত ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটেও, তবে সেখানে একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে অপেক্ষাকৃত নরমপন্থী সরকার আসার সম্ভাবনা খুব কম। বরং বিশৃঙ্খলা, চরমপন্থা এবং সহিংসতার দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। যে গোষ্ঠীগুলোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক না কেন, তারা ইরানের পারমাণবিক উপকরণের দখল পেয়ে যেতে পারে। এটি এমন এক ঝুঁকি যা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সামলাতে পারবে না।

তেহরানের পরমাণু সক্ষমতা অর্জন হলে আঞ্চলিক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে। তুরস্ক ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো এই প্রতিযোগিতায় ছুটবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অবধারিত বিজয়ও উপসাগরীয় দেশের পাশাপাশি মিসর-তুরস্কের মতো দেশের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। তারা ইসরায়েলকে অংশীদার হিসেবে চায়, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারকারী হিসেবে নয়। আরও মৌলিকভাবে বলতে গেলে, বাইরের কোনো শক্তি তাদের অপছন্দের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করবে (বা গণঅভ্যুত্থানে সমর্থন দেবে)— এমন সম্ভাবনা আরব স্বৈরশাসকদের কাছে মোটেও সুখকর নয়।

খামখেয়ালি ট্রাম্প এই প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে গিয়ে একটি অস্পষ্ট বিজয় ঘোষণা করে অন্য কোথাও মনোযোগ দেবেন, তা বলার উপায় নেই। চারটি মূল বিষয় তার হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করবে: জ্বালানি তেলের দাম, শেয়ার বাজার, মধ্যবর্তী নির্বাচন ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার আসন্ন সম্মেলন।

ট্রাম্প নিশ্চয়ই আশা করেছিলেন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করার আগেই তিনি বিশ্বের তেলের মজুতের প্রায় ৩০ শতাংশ (ভেনেজুয়েলা ও ইরানের) নিয়ন্ত্রণ করবেন। আফসোস, ভেনেজুয়েলার চেয়ে ইরান অনেক বেশি কঠিন প্রতিপক্ষ। ট্রাম্পকে তার অবাস্তব প্রত্যাশা কমাতে হবে।

যে অস্পষ্ট ও অসম্ভব লক্ষ্যের দিকে পশ্চিমা জোট ছুটছে তার ব্যয় নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও বেশি হতে পারে। মার্কিনিদের মধ্যে এমন ধারণা ক্রমশ বাড়ছে যে ইসরায়েল তাদের একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে টেনে এনেছে। এর ফলে জায়নবাদী রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হচ্ছে তাদের কাছে। ইসরায়েলের জন্য এটিই হবে সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। কারণ তারা এখন এমন এক সত্তায় পরিণত হয়েছে যেটি ইরান বা ফিলিস্তিন— যেকোনো ইস্যুতেই আলোচনার বদলে গোলাবারুদের সমাধানের পথ বেছে নেয়।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর

    শেয়ার করুন: