আগামীর সময়

৮১ শতাংশ ইসরায়েলির যুদ্ধ সমর্থন কেবলই মতিভ্রম

৮১ শতাংশ ইসরায়েলির যুদ্ধ সমর্থন কেবলই মতিভ্রম

সংগৃহীত ছবি

ইসরায়েলের সরকার বড় করে প্রচার করছে দেশটির ৮১ শতাংশ মানুষ ইরানের ওপর হামলাকে সমর্থন করে। ইহুদি ইসরায়েলিদের মধ্যে এই সমর্থনের হার ৯১ শতাংশ, এমনকি বিরোধী দল বা বামপন্থীদের মধ্যেও প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধের পক্ষে বলে দাবি করা হচ্ছে।

রাজনীতিবিদরা বিশ্ব দরবারে এই সংখ্যাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রমাণ করতে চাইছেন যুদ্ধের পেছনে জনগণের বিশাল সমর্থন বা ম্যান্ডেট রয়েছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এই সংখ্যাটি যতটা সত্যি প্রকাশ করছে তার চেয়ে অনেক বেশি সত্য লুকিয়ে রাখছে।

মার্চের শুরুতে ইসরায়েলের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ যে জরিপ চালিয়েছে সে তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুদ্ধের এই সমর্থন আসলে এককাট্টা কোনো বিষয় নয়। জনমতের এই সমর্থনকে বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে— যেমন এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, এর থেকে কতটুকু লাভ হবে আর তার বদলে কত বড় মূল্য দিতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের লক্ষ্য কি কেবল একটি ছোট হামলা নাকি ইরানের সরকার পতন ঘটানো।

জরিপের এই ৮১ শতাংশ সমর্থনের আড়ালে আসলে ইসরায়েলের জনগণের একদম আলাদা দুই রূপ লুকিয়ে আছে। যারা বর্তমান সরকারের সমর্থক তাদের অবস্থান বেশ পরিষ্কার। তাদের মধ্যে ৯৬ শতাংশই এই যুদ্ধকে সমর্থন করে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর গভীর আস্থা রাখে। তারা বিশ্বাস করে এই যুদ্ধের মাধ্যমে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি ও তাদের সামরিক শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে, এমনকি ৪০ শতাংশ মানুষ মনে করে ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে।

তারা মনে করে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধের ধকল সইতে পারবে এবং এতে খুব বড় কোনো ঝুঁকি নেই। তাদের কাছে এই যুদ্ধের লাভ অনেক বেশি আর ক্ষতি খুবই সামান্য। তাই তারা চায় ইরানের সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলুক।

কিন্তু যারা বিরোধী দলের সমর্থক, তাদের চিত্রটা পুরোপুরি ভিন্ন। যদিও তাদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ মানুষ নামমাত্র এ হামলা সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর ভরসা আছে মাত্র ৯ শতাংশ মানুষের। তারা মনে করে এই যুদ্ধ থেকে খুব একটা বড় কিছু অর্জন করা যাবে না।

মাত্র ১১ শতাংশ বিরোধী সমর্থক বিশ্বাস করে ইরানের সরকার পতন হবে। তবে উল্টো ৬২ শতাংশ মানুষ ভয় পাচ্ছে এই যুদ্ধ বড় কোনো আঞ্চলিক বিপদ ডেকে আনবে। অর্থাৎ সরকার পক্ষের কাছে যেখানে যুদ্ধের লাভ অনেক বেশি, সেখানে বিরোধী পক্ষের কাছে লাভ আর ক্ষতির পাল্লা প্রায় সমান সমান।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, এই অবিশ্বাস সত্ত্বেও কেন ৭৭ শতাংশ বিরোধী সমর্থক যুদ্ধকে সায় দিচ্ছে? এর পেছনে তিনটি কারণ আছে। প্রথমত, তারা বাইরের শত্রুর আক্রমণ নিয়ে সরকার সমর্থকদের চেয়েও বেশি আতঙ্কিত। দ্বিতীয়ত, সরকারের ওপর ভরসা না থাকলেও তারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর ৮৩ শতাংশ আস্থা রাখে। আর তৃতীয়ত, তারা আসলে অন্য এক ধরণের যুদ্ধের কথা ভাবছে। যেখানে সরকার পক্ষের ৮৬ শতাংশ মানুষ ইরানের সরকার পতন চায়, সেখানে বিরোধীদের বড় অংশ চায় কেবল ছোটখাটো কিছু সামরিক ক্ষতি করে দ্রুত যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তিতে যেতে।

ইসরায়েলের ভেতরে থাকা আরব নাগরিকদের অবস্থা আবার সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের ৮০ শতাংশই যুদ্ধের ভয়ে আতঙ্কে থাকলেও সরকার বা বিরোধী কোনো পক্ষের ওপরই তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। এমনকি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর তাদের ভরসা মাত্র ৩৭ শতাংশ। ফলে যুদ্ধের এই আবহে তারা কোনো নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছে না এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ এই হামলাকে সমর্থন করছে। মূলত আস্থা বা ভরসা না থাকলে কেবল ভয়ের কারণে মানুষ যুদ্ধকে মন থেকে মেনে নিতে পারে না।

পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পক্ষের লোকজন যেখানে একটি গোছানো ও পরিষ্কার লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে, সেখানে বিরোধী পক্ষের সমর্থকরা এমন একজনকে নেতা মেনে যুদ্ধে সায় দিচ্ছে যাকে তারা নিজেরাও বিশ্বাস করে না। তারা এমন এক যুদ্ধের কথা ভাবছে যা তারা নিজেরাও জানে যে সফল হবে না।

এই ধরণের দোটানা বা দ্বিধাগ্রস্ত মানসিকতার কারণে বিরোধীদের এই বিশাল সমর্থন আসলে রাজপথে বা কোনো প্রতিবাদে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই জরিপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসেনি, তা হলো যুদ্ধের নৈতিকতা বা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির সীমা কতটুকু হবে। ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে নৈতিক কোনো বিচার নেই, তারা কেবল সামরিক লাভ-ক্ষতির অংক কষছে।

পরিশেষে বলা যায়, এখন যখন ওয়াশিংটন বা জেরুজালেমে বসে বড় বড় নেতারা ৮১ শতাংশ সমর্থনের দোহাই দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন তাদের মনে রাখা উচিত যে এই জনমত আসলে একচেটিয়া নয়। ইসরায়েলিরা এই যুদ্ধে সায় দিয়েছে কিন্তু তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। এই সংখ্যার নিচে আসলে একটি বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত সমাজ লুকিয়ে আছে যারা কেবল বড় ধরণের বিপদের ভয়ে চুপ হয়ে আছে। তাদের এই নীরবতাকে যেন সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়।

লেখক: জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক

    শেয়ার করুন: