মাননীয় স্পিকার, আমি কি বলতে পারি?

সংগৃহীত ছবি
আমাদের দেশে আলাপ-আলোচনার সবচেয়ে অভিজাত এবং সর্বোচ্চ প্ল্যাটফর্ম হলো জাতীয় সংসদ। এখানে সবাই একই সুরে কথা বলেন না। কেউ কথা বলেন অত্যন্ত মার্জিতভাবে, যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজিয়ে। আবার কেউ কেউ আঙুল উঁচিয়ে, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে আমরা এই ‘রাজনৈতিক অভিভাবকদের’ বয়ান নিয়মিত শুনছি। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, সব সিনেমা যেমন পরিবারের সবাইকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে দেখা যায় না, জাতীয় সংসদের সব আলোচনাও সব সময় সব বয়সীদের নিয়ে শোনার মতো থাকে না।
বিগত দেড় দশক আমরা একটি একপাক্ষিক ও একঘেয়ে সংসদ দেখে আসছি। রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর নানা টানাপোড়েন আর সন্দেহ-অবিশ্বাসের বাতাবরণ পার হয়ে অবশেষে আমরা আবার একটি বহুদলীয় সংসদ ফিরে পেয়েছি। এবারের সংসদ আওয়ামী লীগহীন। ফলে মমতাজের চটুল বন্দনাগীতি কিংবা বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া প্রবীণ সাংসদদের দেখতে না পাওয়ার স্বস্তি যেমন আছে, তেমনি কৌতূহলও আছে প্রচুর। ‘মাননীয় স্পিকার, বসে পড়ুন’, ‘এক্সপাঞ্জ করা হলো’ কিংবা ‘খেলা হবে’—এই শব্দবন্ধগুলো গত আমলে আমাদের সামাজিক হাস্যরসের প্রধান উপকরণ ছিল। এবার সেই জায়গা দখল করতে পারে আরও গরম এবং ‘তরল’ সব বাণী।
আমাদের ছোট ও মাঝারি গোছের অনেক নেতা মনে করেন, প্রতিপক্ষের বড় কোনো নেতাকে যত কষে গালি দেওয়া যাবে, দলের হাইকমান্ড তত বেশি খুশি হবে। এই গালাগালের মচ্ছব এখন এমন এক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে বাংলা শব্দভাণ্ডারের সব বিশেষণ যেন আজ রাজনীতির মাঠেই আবিষ্কৃত হচ্ছে। সামনে সংসদীয় ক্ষমতা সংহত করার লড়াই; তাই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সেই বিশাল অট্টালিকায় যারা ঢুকে পড়লেন, সেখানে ফ্লোর পেতে অনেকেই এখন কণ্ঠে শাণ দিচ্ছেন। কে কত বড় ‘বুলবুলি’ অথবা 'কাক' হতে পারেন, তার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। আর দুটিই তো পাখি।
সংসদ অধিবেশন যে আগামী দিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট’ হতে যাচ্ছে, তার প্রমাণ এখনই পাওয়া যাচ্ছে- বলে ফেসবুকে একজনের পোস্ট দেখলাম। তিনি লিখেছেন, ফেসবুকে এক একটি লাইভে যখন ৮৫ হাজার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তখন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পাশাপাশি একটি ‘সংসদ রিলস’ ডিপার্টমেন্ট খোলার প্রস্তাব করাই যায়। এই বিভাগের কাজ হবে সংসদীয় ভাষণের চুম্বক এবং মুখরোচক অংশ দিয়ে ছোট ছোট রিলস বানানো। আর সেই কনটেন্টের কপিরাইট ক্লেইম করে ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক থেকে যে ডলার আসবে, তা দিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও হয়তো ফুলেফেঁপে উঠতে পারে!
তবে এবারের সংসদের অন্যতম আকর্ষণ হবে ‘ইতিহাস চর্চার লড়াই’। আওয়ামী লীগের একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চার বিপরীতে প্রথমবারের মতো একাত্তর নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান এবং লিগের অনুপস্থিতি কোন নতুন ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করে, তা দেখার বিষয়। আওয়ামী লীগ একসময় সংসদকে প্রায় কৌতুককর জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। একদিকে হিরো আলমকে নির্বাচনের মাঠে রাখা, অন্যদিকে সংসদে মমতাজ বা প্রায় ‘ফসিল’ হয়ে যাওয়া রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়ে রাখা। সেই তুলনায় এবার ‘আমীর হামজারা’ কী করেন, সেটাই দেখার প্রতীক্ষায় সাধারণ মানুষ।
নির্বাচনের মাঠে এবারও এক তরুণ নেতা ও মডেলের উপস্থিতি মানুষকে হিরো আলমের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। যদিও তিনি জিতে আসতে পারেননি। তবে তিনি যদি জিতে আসতেন, তবে সংসদের রূপ কেমন হতো তা কল্পনা করতে আমরা পুরনো একটি স্মৃতি রোমন্থন করতে পারি।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ আমলের এক অধিবেশনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, অমুক সম্মানিত এমপিকে (খুব সম্ভবত জামায়াত নেতা) কি আমি শুয়োরের বাচ্চা বলতে পারি?’ স্পিকার উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, আপনি বলতে পারেন না।’ সুরঞ্জিত সেন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, ‘তাহলে আর কী করার, ঠিক আছে মাননীয় স্পিকার, আপনাকে ধন্যবাদ।’ আইনের মারপ্যাঁচে সুরঞ্জিত কোনো বাজে কথা বলেননি; তিনি কেবল একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা যাবে কি না, তা সরল মনে জানতে চেয়েছিলেন মাত্র। ফলে সেই কথোপকথন আর এক্সপাঞ্জ হয়নি।
ঢাকার সেই পরাজিত তরুণ নেতা যদি সংসদে আসতেন, তবে তিনিও হয়তো এমন সরল মনে প্রশ্ন তুলতেন—‘মাননীয় স্পিকার, আমি কি তাকে চাঁদাবাজ বলতে পারি?’ এই গ্যারান্টি আমরা কেউ দিতে পারতাম না। তারপরও এই ত্রয়োদশ সংসদ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হবে বলে আশা করা যায়। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিনোদনের খোরাকও কম জুটবে না। আর যেকোনো উপায়েই হোক, বাংলাদেশের মানুষের কাছে রাজনীতিই এখন প্রধানতম বিনোদন এবং একই সাথে এটি আমাদের বাঁচা-মরার প্রশ্নও বটে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

