আগামীর সময়

ট্রাম্পের মুখে ‘ফাঁকা বুলি’

ট্রাম্পের মুখে ‘ফাঁকা বুলি’

ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধের ২৬তম দিন আজ। নিজস্ব রণকৌশলে এখনো ময়দানে টিকে আছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান। এদিকে যুদ্ধ যেন মার্কিন মিত্র জোটের জন্য গলার কাটা। শান্তি আলোচনার নামে একের পর এক ফাঁকা বুলি আওরাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউস থেকে যখন কোনো বার্তা আসে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অদ্ভুত সব আচরণ আর খামখেয়ালি কথাবার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় থাকে না। তবে গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে, প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। কারণ পরিস্থিতি তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে না।

ইরান তার অপ্রতিসম রণকৌশলে বেশ শক্তিশালী ও টিকে থাকার ক্ষমতা দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়, তার ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানগুলো গুটিয়ে আনার কথা ভাবছেন তিনি।

ট্রাম্পের এই লক্ষ্য বরাবরই অস্পষ্ট। তিনি কিছু পয়েন্ট তুলে ধরলেও তাতে কোনো স্বচ্ছতা নেই। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও তাদের সামরিক শিল্প ধ্বংস করা হচ্ছে। ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী নাকি প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। ইরানকে কখনোই পরমাণু সক্ষমতার ধারেকাছে যেতে দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত।

এছাড়া তিনি ইসরায়েল, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। যদিও ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রমাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এই নিরাপত্তার আশ্বাস এখন অনেকটাই মূল্যহীন।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনেকটা দিবাস্বপ্নের মতো। তিনি চাইছেন এই পথ ব্যবহারকারী দেশগুলোই যেন এর পাহারার দায়িত্ব নেয়। তেহরান নির্মূল হওয়ার পর এটি নাকি তাদের জন্য সহজ সামরিক অপারেশন হবে। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো দেশই এমন কাজে এগিয়ে আসেনি। প্রণালীটি এখনো ইরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণেই আছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই ধোঁয়াশা আরও বাড়িয়েছেন। তিনি দাবি করলেন, ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই এই মিশন শেষ করার লক্ষ্য ছিল পেন্টাগনের। লেভিটের দাবি অনুযায়ী ইরানের শাসনব্যবস্থা নাকি পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— পঙ্গু হওয়া তো দূরে থাক, ইরান এখনো তাদের পছন্দমতো জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। এমনকি তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখন ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া (যেখানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে) পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

আলোচনার গুজব নিয়ে অনেক কথাই শোনা যাচ্ছে। ২২ মার্চ শোনা গেল ট্রাম্পের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবফের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে গালিবফ একে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে ও নিজেদের বিপদ থেকে বাঁচাতে ওয়াশিংটন এই মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে মিসর, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাধ্যমেও কিছু বার্তার আদান-প্রদান হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

২৩ মার্চ ট্রাম্প আবার এক নতুন আল্টিমেটাম দিলেন— ইরান যদি হরমুজ প্রণালী সবার জন্য খুলে না দেয়, তবে তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হবে। আবার পরক্ষণেই তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তাই তিনি পেন্টাগনকে পাঁচ দিনের জন্য হামলা পিছিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তেহরান অবশ্য এসব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। ট্রাম্পের এসব বক্তব্য আসলে তেলের দাম কমানোর কৌশল ও নতুন কোনো সামরিক হামলার জন্য সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সারসংক্ষেপে বলতে গেলে, কূটনীতিকে এখানে কেবল সময় কেনার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্পের এসব অস্পষ্ট আশ্বাস আসলে যুদ্ধের মাঝে বিশ্ববাজারকে কিছুটা শান্ত রাখার চেষ্টা। কিন্তু এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও তেহরান তার লক্ষ্য ও সিদ্ধান্তে অনড়।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তর

    শেয়ার করুন: