আগামীর সময়

গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রণালয় খসরুর কাঁধে, চট্টগ্রাম পেল প্রথম অর্থমন্ত্রী

গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রণালয় খসরুর কাঁধে, চট্টগ্রাম পেল প্রথম অর্থমন্ত্রী

সংগৃহীত ছবি

পাকিস্তান আমলের মন্ত্রী চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক প্রয়াত মাহমুদুন্নবী চৌধুরীর সন্তান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। টানা প্রায় দুই দশক বিএনপির প্রতিকূল সময়ে মাঠে নেতৃত্ব দেওয়া খসরু তারেক রহমানের মন্ত্রীসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম পেয়েছেন প্রথম একজন অর্থমন্ত্রী। পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবেও চট্টগ্রামে তিনিই প্রথম।


অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বিনিয়োগহীন ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দাঁড় করানোই হবে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চট্টগ্রামের ভৌগলিক ও পরিবেশগত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।


আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায়। সেটি চট্টগ্রাম-১০ আসনের আওতাধীন। তবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসন থেকে। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। উপনির্বাচনে তার ছেড়ে দেওয়া আসনটিতে ব্যবসায়ী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালে দুই দফায় এবং ২০০১ সালেও তিনি একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বেগম জিয়ার সর্বশেষ মন্ত্রীপরিষদে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।


আমীর খসরুর বাবা মাহমুদুন্নবী চৌধুরী, যিনি নবী চৌধুরী নামে পরিচিত। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানের আইনপরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং-সীতাকুণ্ড আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে গণযোগাযোগ মন্ত্রী এবং পরে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ছেলে আমীর খসরু সেই ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই বিএনপি নেতৃত্বের নজরে পড়েছিলেন এবং রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি হয়েছিল।


২০০৭ সালে এক-এগারো প্রেক্ষাপট এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির পর সাংগঠনিক অবস্থা যখন এলোমেলো তখন ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের একজনে পরিণত হন খসরু। কারান্তরীণ বেগম খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দেশে বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে যে কজন নেতা জোরালো ভূমিকা রাখেন, তাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য খসরু ছিলেন অন্যতম।


গত ১২ ফেব্রুয়ারি হয়ে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর থেকেই আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থমন্ত্রী হচ্ছেন, এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাধারণের মাঝে। শেষ পর্যন্ত আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমান মন্ত্রীসভার তালিকা ঘোষণার পর সেই গুঞ্জন সত্যি হয়ে এলো।


২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে সরকার গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের মধ্যে যেসব মন্ত্রণালয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তার মধ্যে দুটি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভার ষাটোর্ধ আমীর খসরুর কাঁধে দিয়েছেন জিয়াপুত্র, যিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার ক্যাবিনেটেও ছিলেন।


অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, ‘আমি যতদূর জানি, চট্টগ্রাম থেকে আগে কখনও অর্থমন্ত্রী কিংবা পরিকল্পনামন্ত্রী কেউ ছিলেন না। ড. মল্লিক অর্থমন্ত্রী ছিলেন, উনাকে অনেকে চট্টগ্রামের ভেবে বিভ্রান্ত হন। আসলে উনি ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন। উনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য থাকার কারণে অনেকে উনাকে চট্টগ্রামের মনে করেন। সেই হিসেবে আমীর খসরু সাহেব চট্টগ্রাম থেকে শুধু প্রথম অর্থমন্ত্রী নন, প্রথম পরিকল্পনামন্ত্রীও।’


‘একজন মন্ত্রী তিনি যে জেলারই বাসিন্দা হোন না কেন, তাকে আঞ্চলিকতার মাপকাঠিতে আটকানো সমীচীন নয়। তবে চট্টগ্রাম যেহেতু ভৌগলিক ও পরিবেশগতভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়ে আমীর খসরু সাহেব আগ্রহী হবেন বলে আমি আশা করি, যেহেতু চট্টগ্রামের লোক হিসেবে উনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে।’


আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর লন্ডন থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে পৈতৃক ব্যবসায় যোগ দেন। তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন এবং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম চেম্বারের পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।


নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি তো এখন ভালো অবস্থায় নেই। বিনিয়োগ একেবারেই নেই। বলতে গেলে অর্থনীতি অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। এটা সুবিধাজনক অবস্থায় নিয়ে আসার কাজটা খুব জটিল। এটা উনার জন্য খুব চ্যালেঞ্জের কাজ হবে। এটা উনি কীভাবে সামলাবেন, সরকারের পলিসি কী হবে, সেগুলো দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’


‘তবে একটা বিষয়, চট্টগ্রামকে ভৌগলিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। এটা সব সরকার, সব মন্ত্রীরাই বলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করেন না। আমীর খসরু সাহেব যদি চট্টগ্রামের ভৌগলিক ও পরিবেশগত সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমরা শুধু পরামর্শ দিতে পারি আর পর্যবেক্ষণ করতে পারি। আরেকটু সময় যাক, আমরা দেখতে থাকি।’


পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে খ্যাত আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত নির্বাচনে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলম পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৬৮১ ভোট।

    শেয়ার করুন: