যুদ্ধের ধোঁয়ায় বিশ্বকাপে কালো মেঘ

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপ কড়া নাড়ছে দরজায়। অপেক্ষা ‘ফুটবল যুদ্ধের’। মাঠের যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে গোলা-বারুদের যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। তাতে আগামী জুন-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় হতে যাওয়া ঘিরে উৎসবের আবহের বদলে এখন শঙ্কার কালো মেঘ। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ইরানের অংশ নিবে কিনা, বড় হয়ে উঠেছে প্রশ্নটা। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা জানিয়েছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে তারা।
বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমনিতেই সাপে-নেউলে সম্পর্ক ইরানের। শনিবারের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ আরও কয়েকজন শীর্ষকর্তা নিহত হওয়ার পর সম্পর্কটা বিষিয়ে গেছে আরও। ইরানিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদী তাজ এরই প্রতিবাদে দিলেন বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি।
ইরানিয়ান টিভি চ্যানেল ‘তেহরানকে’ দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেহেদী তাজ জানালেন, ‘আজ যা ঘটেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণের ফলে, এটা অসম্ভব যে আমরা বিশ্বকাপ খেলতে যাব (যুক্তরাষ্ট্রে)।’ এবারের বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে মেহেদী তাজসহ আরও কয়েকজন ইরানি ফুটবল কর্তার ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তখনই প্রতিবাদে বিশ্বকাপ ড্র বয়কট করেছিল ইরান। এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে মারা গেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাতে ফুটবলারদের যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে যাওয়ার পথটা বন্ধই হতে চলেছে একপ্রকার। তবে বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত যে কেবল ফেডারেশনের ওপর নির্ভর করছে না এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মেহেদী তাজ, ‘ক্রীড়া প্রধানদেরই এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
বিশ্বকাপে ইরান ‘জি’ গ্রুপে রয়েছে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও মিসরের সঙ্গে। তাদের তিন ম্যাচই খেলার কথা যুক্তরাষ্ট্রে। বেলজিয়াম ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলসে আর মিসরের বিপক্ষে সিয়াটলে। শুধু তাই নয়, নিজেদের গ্রুপে রানার্স-আপ হলে শেষ ৩২-এই যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে পারে ইরান।
ফিফা যা বলছে
৪৮ দল নিয়ে নির্ধারিত সময়েই বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায় ফিফা। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এড়ানোরও সুযোগ নেই। বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তারা। কার্ডিফে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) বার্ষিক সভা শেষে ফিফা মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন, ‘আমিও আপনাদের মতো আজ (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরান সম্পর্কে খবরটি পড়েছি। বিস্তারিত মন্তব্য করার সময় নয় এখন। তবে বিশ্বজুড়ে সব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ফিফা।’
ফিফা মহাসচিব অবশ্য আশাবাদী ৪৮ দল নিয়ে নির্ধারিত সময়েই বিশ্বকাপ আয়োজনের, ‘আমাদের আসল লক্ষ্য নিরাপদ একটি বিশ্বকাপ আয়োজন, যেখানে সব দল অংশ নেবে। আগের মতোই তিন আয়োজক দেশের সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব আমরা। নিশ্চিত করা হবে সবার নিরাপত্তা।’
ইরান বয়কট করলে বিকল্প কারা
এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না খেলায় সুযোগ পেয়েছিল র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা স্কটল্যান্ড। ফুটবল বিশ্বকাপের জন্যও ফিফার ‘নির্ধারিত বিকল্প দল’-এর নিয়ম রয়েছে। তাতে ক্রিকেটের মতই সেই মহাদেশের র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দল কিংবা প্লে-অফে হারা দলের সুযোগ থাকবে। এই দুই বিবেচনায় ইরানের বিকল্প হতে পারে আরব আমিরাত কিংবা ইরাক। এই অঞ্চল থেকে ইরাক প্লে-অফ নিশ্চিত করেছে। ইরান নাম প্রত্যাহার করলে ইরাকের জায়গা হতে পারে বিশ্বকাপের মূল পর্বে। সমান্তরালে প্লে অফে ইরাকের জায়গা নেবে আরব আমিরাত।
বিশ্বকাপে নাম প্রত্যাহার
১৯৩০ বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল জাপান, থাইল্যান্ড ও মিসর। ১৬ দলের বিশ্বকাপটা তাই হয়ে যায় ১৩ দলের। একইভাবে ১৯৫০ বিশ্বকাপে ভারত ও ফ্রান্স দুই দেশ যোগ্যতা অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত খেলেনি। ড্রয়ের পরে তারা নাম প্রত্যাহার করে নেয়। আর্জেন্টিনা সেবার বাছাইপর্ব থেকেই নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করার হুঁশিয়ারি দিলে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছিল ইউরোপের কয়েকটি দেশ। তবে ট্রাম্প সুর নরম করলে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়নি আর।
সংকটে ফিনালিসিমা
বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা ও ইউরোজয়ী স্পেনের ফিনালিসিমা হওয়ার কথা ২৭ মার্চ কাতারের দোহায়। সেই কাতারেও ইরান এরই মধ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই ম্যাচের ভবিষ্যৎও অন্ধকার। স্প্যানিশ সংবাদ মাধ্যম ‘এএস’ জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা ও স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন এরই মধ্যে কয়েকদিন আগে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করছে। আর্থিক লাভের চেয়ে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে।

