সৌন্দর্যের চূড়ান্ত প্রদর্শনীর পর বিরক্তিকর ফুটবল

সংগৃহীত ছবি
প্রশ্নটা আপনি যে কাউকে করতে পারেন। ফুটবল খেলা কেন দেখেন? উত্তর আসবে, আনন্দের জন্য। সে আনন্দটা কীভাবে পান? খেলার সৌন্দর্য এবং অবশ্যই গোলে! গোলের খেলা ফুটবল, তাই গোলকে খেলার প্রাণও বলা যায়। এই প্রাণ না থাকলে ওই ম্যাচ কি আদৌ উপভোগ করা যায়? চ্যাম্পিয়নস লিগের আর্সেনাল-আতলেতিকো মাদ্রিদ ও পিএসজি-বায়ার্ন মিউনিখের ম্যাচ দুটি যেন আবার মনে করিয়ে দিল, ফুটবলে গোলের বিকল্প নেই।
বিজয়ী ফুটবল হেরেছে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে
ওই দুটি ম্যাচে দেখুন। একটি ৯ গোলের ম্যাচ, অন্যটি পেনাল্টি থেকে আসা মাত্র দুই গোলের খেলা। অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর এক সেমির বিপরীতে অতি ম্যাড়মেড়ে এক লড়াই।
সৌন্দর্যের চূড়ান্তে পৌঁছানো একটি ম্যাচের পর ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ফুটবল নেমে আসে অতি সাধারণ মানে। সেটা খেলার দিকে থেকেই বলুন কিংবা দর্শক উপভোগের জায়গা থেকে। বিশ্ব ফুটবল পিএসজি-বায়ার্ন ম্যাচে মানুষ যেভাবে সম্মোহিত হয়েছে, যে রোমাঞ্চ অনুভব করেছে, সেটা আর্সেনাল-আতলেতিকো মাদ্রিদের খেলায় ছিল অনুপস্থিত।
‘টোটাল ফুটবল’ বনাম ‘বাস পার্ক’
পার্ক ডি প্রিন্সে ফুটবল দেখেছে স্মরণকালের অন্যতম সেরা এক সেমিফাইনাল। হাকিমি-কেইনরা যেন এদিন গোলের বন্যা বইয়ে দিতেই মাঠে নেমেছিলেন। রেকর্ডের রাতে শেষ পর্যন্ত তারাও সফল। ইউসিএলের ইতিহাসে সেমির এক লেগে এত গোল আর দেখেনি কেউ।
প্রতিপক্ষের জালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন পিএসজি দিয়েছে পাঁচ গোল। বায়ার্নও কম যায়নি, তারাও গুনে গুনে চারটি গোল শোধ করেছে। ফরোয়ার্ডরা কিছু সুযোগ নষ্ট না করলে গোলের সংখ্যা বাড়তেও পারত। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণে ভরপুর এই ৯ গোলের থ্রিলারের পর তাই প্রশংসায় ভাসছে দুই জায়ান্টের লড়াই।
পিএসজি-বায়ার্ন ম্যাচটি নিয়ে যেন আলোচনার শেষ নেই। সাবেক ফুটবলার থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম; স্তুতিতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন সবাই। সাম্প্রতিককালের তো বটেই, অনেকে এ ম্যাচকে বলছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ। ফরাসি পত্রিকা লেকিপ তো এটাকে ‘টোটাল ফুটবলই’ আখ্যায়িত করেছে। ম্যাচটা কখনোই ডিফেন্সিভ মুডে যায়নি, পিএসজি যখন ৫-২ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল, তখনো নয়! দুপক্ষই আক্রমণের বৈচিত্র্যে ভাসিয়ে গোল করার চেষ্টায় ছিল। একমুহূর্তের জন্যও তাই চোখ সরানো যায়নি এ ম্যাচ থেকে।
পিএসজি-বায়ার্ন আক্রমণাত্মক ও গোলে ভরপুর ম্যাচ যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তার উল্টো চিত্র আরেক সেমিফাইনাল নিয়ে। ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই আর্সেনাল-আতলেতিকো লড়াই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছিল ট্রলের বন্যা। কমবেশি সবারই একই কথা, দুই দল গোল তো করতেই চাইবে না, হয়তো নিজেদের হাফ ছেড়ে প্রতিপক্ষের হাফেও আসার কষ্ট করবে না!
ট্রল রূপ নিয়েছে বাস্তবে। অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে আর্সেনাল ও আতলেতিকো মাদ্রিদ যেন বিরক্তির উদ্রেক করেছে। ‘বাস পার্ক’ তো নয়, দুই দল যেন নিজেদের হাফে পার্ক করে রেখেছিলেন বোয়িং বিমান! ঘুমপাড়ানি ফুটবল
পিএসজি-বায়ার্ন ম্যাচে চোখের পলক ফেলার অবস্থা ছিল না। এই এক দল আক্রমণ করছে তো এই আরেক দল গোল করল বলে! পুরো ৯০ মিনিট যেন এক রোলার কোস্টার রাইড।
এদিকে আর্সেনাল-আতলেতিকো মাদ্রিদ ম্যাচ দেখতে গিয়ে যেন ঘুমিয়েই পড়েছেন দর্শক! টানটান উত্তেজনার এক রাতের পর ফুটবল দেখেছে স্মরণকালের অন্যতম বাজে ট্যাকটিকসের ম্যাচ।
আর্সেনাল ও আতলেতিকো মাদ্রিদ যেন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, তারা গোল করবে না, করার চেষ্টাও করবে না। ৯০ মিনিটে দুই দলের শট অন টার্গেট তাই মাত্র সাত! আগের রাতে পিএসজি-বায়ার্ন ম্যাচে শট অন টার্গেট ছিল এর দ্বিগুণ।
শুধু কি গোলপোস্টে শট নেওয়া, আর্সেনাল-আতলেতিকো ফুটবলারদের শরীরী ভাষাও ছিল আগের রাতের ম্যাচের ঠিক বিপরীত। পিএসজি ও বায়ার্ন যেখানে গোলের জন্য মরিয়া ছিল, আর্সেনাল ও আতলেতিকো ব্যস্ত ছিল নিজেদের রক্ষণভাগ সুরক্ষিত রাখতে।
রক্ষণ সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে আর্সেনাল ও আতলেতিকো হুমকিতে ফেলেছে ফুটবলকেই। শুধু জেতার জন্যই জেতা, সুন্দর ফুটবলের ধারেকাছেও নেই; এমন অভিযোগের তীর বহু আগেই তাক করা দুই ক্লাবের দিকে।
নিজেদের ঘরোয়া লিগ কিংবা ইউরোপের প্রতিযোগিতা; সাম্প্রতিককালে আর্সেনাল ও আতলেতিকো খেলছে অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক ফুটবল। অনেক বেশি গোল করে ম্যাচ জিতেছে তারা, এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। এক কিংবা দুই গোল, জয়ের ব্যবধানটা থাকে এমনই।উল্টো চিত্র পিএসজি ও বায়ার্নের। দুই দলই গোলের শিকারি। প্রতিপক্ষকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে দেওয়াই যেন তাদের কাজ। এতে যদি নিজেরাও কিছু হজম করতে হয়, তাতেও মাথাব্যথা নেই কোচের। দুই দলের ম্যাচ মানেই যেন দর্শকের জন্য ‘চোখের শান্তি’।
‘ভীতু’ ফুটবলেই বিপাকে আর্সেনাল
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের খেলার ধাঁচটা বজায় রেখেই শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে ছিল আর্সেনাল। তবে একের পর এক হোঁচট ও ম্যানচেস্টার সিটির টানা জয়ে লড়াইটা জমে উঠেছে। সমীকরণ এখন এমন, আর্সেনাল সিটি যদি নিজেদের সব ম্যাচ জিতে যায়, তাহলে শিরোপা নির্ধারণ করা হবে গোল ব্যবধানে।
সমীকরণ যখন এই, প্রায় সবার বাজি সিটির পক্ষেই। কারণ, বড় ব্যবধানে ম্যাচ জেতার অভ্যাস তো তাদের আছেই। অন্যদিকে ‘ভীতু’ আর্সেনাল গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়বে, এই তো স্বাভাবিক!
আতলেতিকো অবশ্য লা লিগার শিরোপা দৌড় থেকে ছিটকে গেছে আগেই। এই মুহূর্তে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করা আতলেতিকোর লক্ষ্য সরাসরি চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ালিফাই করা।
ফাইনালে কি সৌন্দর্যের জয় হবে?
সেমির ড্রয়ের পর অনেকেই বলেছিলেন, শিরোপা তো এবার নির্ধারণ হবে শেষ চারে! পিএসজি-বায়ার্ন ম্যাচে যেই জিতবে, শেষমেশ তার হাতেই উঠবে শিরোপা। আর্সেনাল-আতলেতিকো তো শুধু নিয়মরক্ষার লড়াইয়ে নামছে।
আর্সেনাল ও আতলেতিকো সমর্থকরা এমন কথায় রাগ করতেই পারেন। কিন্তু ঘটনা যে একেবারে মিথ্যে নয়, সে তো প্রথম লেগেই প্রমাণিত! পিএসজি ও বায়ার্ন যে ফুটবল খেলেছে, এর সামনে আর্সেনাল ও আতলেতিকো দাঁড়াতে পারবে কি না, সে নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
এমন কথাও উঠেছে, এবারের ফাইনাল হতে যাচ্ছে অন্যতম বাজে ও একপেশে ফাইনাল। ফুটবলবোদ্ধারা বলছেন, পিএসজি ও বায়ার্নের মধ্যে যারাই ফাইনালে উঠুক, প্রতিপক্ষকে অনেক গোলের লজ্জা দিয়েই শিরোপা উঁচিয়ে ধরবে।
কেউ কেউ তো এক কাঠি ওপরে। কিছুটা খোঁচা মেরে অনেকে বলছেন, আর্সেনাল ও আতলেতিকোর জন্য ফাইনালে ওঠাই হবে বড় শাস্তি! সেমি থেকে সম্মানজনক বিদায় নিলেই এর চেয়ে ভালো বৈকি।
যাই হোক, রক্ষণাত্মক কৌশলের সঙ্গে ফুটবল সৌন্দর্যের লড়াই হতে যাচ্ছে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে।









