আশ্রয়নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান ব্রিটেনের ধর্মীয় নেতাদের

যুক্তরাজ্যে শরণার্থীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ সীমিত করতে সরকারের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশটির ধর্মীয় নেতারা।
তারা বলেছেন, আশ্রয় ও নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নিয়মে প্রস্তাবিত পরিবর্তন সমাজে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই এ উদ্যোগে ‘ধীরে চলা’ এবং নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সাতজন বিশপ, তিনজন রাবী ও একজন ইমামসহ একদল ধর্মীয় নেতা দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক চিঠিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের উদ্দেশে লিখেছেন, তার প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে তাদের ‘গভীর উদ্বেগ’ রয়েছে। চিঠিতে তারা মন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তারা যেন ‘থামেন, শোনেন এবং প্রস্তাবগুলো সংশোধন করেন’।
এই চিঠিতে যে উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে, তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির অন্তত ১০০ জন এমপি। তাদের দাবি, এ পরিবর্তন সরকারের সামাজিক সংহতির অঙ্গীকারকে করবে দুর্বল।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক আশ্রয়প্রার্থী ও তাদের সঙ্গে থাকা শিশুদের আবেদন মঞ্জুর হলে ৩০ মাসের জন্য সুরক্ষা দেওয়া হবে। এরপর তাদের নিজ দেশ নিরাপদ বিবেচিত হলে সেখানে ফিরে যেতে হবে।
এতে বর্তমান ব্যবস্থা কার্যত বদলে যাবে। এখন শরণার্থীরা পাঁচ বছরের জন্য সুরক্ষা পান, পরিবারকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার সুযোগ পান এবং পরে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতির জন্য করতে পারেন আবেদন।
নতুন পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, সরকার স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের যে প্রস্তাব দেবে, তা কেউ প্রত্যাখ্যান করলে পরিবারসহ তাকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থার আওতায় পড়বে শিশুরাও।
এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শাবানা মাহমুদ একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করেছেন। এতে যেসব পরিবারের আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হয়েছে, এমন ১৫০টি পরিবারকে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়লে পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অন্যথায় জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হবে তাদের।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, লেস্টারের লর্ড বিশপ মার্টিন স্নো, ফিঞ্চলি প্রগ্রেসিভ সিনেগগের রাবী রেবেকা বির্ক এবং লিডস মক্কা মসজিদের ইমাম কারি আসীম।
ধর্মীয় নেতারা চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমরা মন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন তাদের প্রস্তাব নিয়ে ধীরে এগোন এবং নতুন করে ভাবেন। কারণ, এসব প্রস্তাবে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে।’
তারা আরও লিখেছেন, ‘যে ব্যাপক পরিবর্তন আগামী ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যের ১০ লাখের বেশি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে, তা কোনো তাড়াহুড়োর মধ্যে করা উচিত নয়।’
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি সুস্পষ্ট পথ, সংহত সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। যেসব নীতি মানুষের অবস্থানকে আরও অনিশ্চিত করে এবং নাগরিকত্বের পথকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়, সেগুলো সেই সংহতিকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে।’
আগের ব্যবস্থায় শরণার্থীরা পাঁচ বছরের জন্য যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পেতেন। এরপর তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে শরণার্থী সুরক্ষা পাওয়া ব্যক্তিদের অবস্থান প্রতি ৩০ মাস অন্তর পর্যালোচনা করা হবে। তাদের দেশ আর ঝুঁকিপূর্ণ না থাকলে সরকার তাদের ফেরত পাঠাতে পারবে।
তবে বাস্তবে সুদান, ইরিত্রিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে অনেকে শরণার্থী সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য থাকবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের আর্থিক সহায়তা কমানোর উদ্যোগ
সরকার আইন পরিবর্তন করে আশ্রয়প্রার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করছে। একই সঙ্গে যারা অবৈধভাবে কাজ করছেন, কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন অথবা যাদের নিজস্ব আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাদের অর্থসহায়তাও বন্ধ করা হবে।
অনেক বছর ধরেই এমন বিধান রয়েছে, যার আওতায় কোনো আশ্রয়প্রার্থীর প্রাথমিক আবেদন ১২ মাসেও নিষ্পত্তি না হলে এবং এতে তার নিজের কোনো দোষ না থাকলে তিনি কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন। এখন তারা কোনো ধরনের চাকরিতে আবেদন করতে পারবেন, তার পরিধি বাড়াচ্ছে সরকার৷
তবে বাস্তবে কাজের অনুমতি পেতে এখনো প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থীকে হোম অফিসের আলাদা অনুমোদন নিতে হবে, যা বেশ জটিল। আবার যেসব চাকরিতে তারা তাত্ত্বিকভাবে আবেদন করতে পারবেন, সেসবের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা অনেকেরই নেই।
স্থায়ী বসবাসের পথ আরও দীর্ঘ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের আরেকটি প্রস্তাবে অনেকের ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হচ্ছে। আর যেসব শরণার্থী বা সীমিত মেয়াদের বসবাসের অনুমতি পাওয়া ব্যক্তি সরকারি সহায়তা নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
সরকার এখন এসব পরিবর্তন নিয়ে পরামর্শ করছে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর জন্য প্রাথমিক ও গৌণ, উভয় ধরনের আইন প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এসব প্রস্তাব আটকে দেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন লেবার পার্টির এমপিরা।

