ইরান যুদ্ধে নতুন মোড়
পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস অবকাঠামো

কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা। ফাইল ছবি
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে আসছিল ইরান। কিন্তু তেহরান যুদ্ধের ২০তম দিনে এসে প্রতিবেশী দেশগুলোর তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালানো শুরু করে।
এতে যুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ার শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে।
ইতিমধ্যে তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার। যা ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে ইউরোপে বেড়েছে গ্যাসের দামও।
ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে বুধবার হামলা চালায় ইসরায়েল। এছাড়া এদিন ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিবকেও হত্যা করে তেল আবিব।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে ব্যাপক হামলা চালায়। এসব হামলায় তেল শোধনাগার ও গ্যাসের অবকাঠামোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বুধবার রাতে কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় হামলা চালায় ইরান।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তাদের রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্সে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পরে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পরবর্তীতে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক অ্যাটাশেদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয় রাস লাফানের ওপর এই হামলাকে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি ‘সরাসরি হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি ইরানকে এই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন পন্থা’ অবলম্বনের জন্য অভিযুক্ত করেছে।
অন্যদিকে কাতারের ওপর হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে লিখেছেন, ইরানের ভবিষ্যতের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণে আমি ব্যাপক মাত্রার সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের অনুমোদন দিতে চাই না। কিন্তু কাতারের এলএনজি যদি আবারও আক্রান্ত হয়, তবে আমি তা করতে দ্বিধা করব না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূপাতিত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের কারণে হাবশান গ্যাস স্থাপনা এবং বাব তেলক্ষেত্রে আগুন ধরে যায়। আবুধাবি মিডিয়া অফিস জানায়, স্থাপনাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার ইরান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকেও লক্ষ্যবস্তু বানায়। দেশটি জানিয়েছে, বুধবার রিয়াদের দিকে ছোড়া চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলে একটি গ্যাস স্থাপনায় ড্রোন হামলার একটি প্রচেষ্টা তারা প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়ানবু বন্দরে অবস্থিত সৌদি আরামকোর সামরেফ শোধনাগারে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে। এখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে।
কুয়েতের তেল স্থাপনায়ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটি জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মিনা আবদুল্লাহ শোধনাগারের একটি কার্যরত ইউনিটে ড্রোন আঘাত হেনেছে। এর আগে মিনা আল-আহমাদি তেল শোধনাগারেও ড্রোন হামলা চালানো হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলো কি ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালাবে?
এটি ঘটলে যুদ্ধের একটি নতুন পর্যায় শুরু হতে পারে।
বুধবার রিয়াদে ১২টি মুসলিম-প্রধান দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে অংশ নিয়ে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ বলেছেন,
‘আমরা প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখি।’
তিনি ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অতিরিক্ত চাপ রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে উল্টো ফল দিতে পারে।
বৃহস্পতিবার প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আরও কঠোর হয়ে উঠেন ইরানের বিষয়ে। তিনি আবারও তেহরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তার দেশ ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর ইরানের হামলা সহ্য করার সীমা সীমিত।
ইরানকে তার কৌশল তাৎক্ষণিকভাবে পুনঃমূল্যায়ন করার অনুরোধ জানান সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বৃহস্পতিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে কথা বলেছেন।
পরে কাতার জানায়, দুই নেতা মনে করেন, ইরানের হামলা একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা। যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে ওমান।
দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ওমান আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি সমুন্নত রাখার, বেসামরিক স্থাপনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে হামলা থেকে বিরত থাকার অপরিহার্যতার ওপর জোর দেয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মেহরান কামরাভা আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের বাড়তে থাকা হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারকে কূটনৈতিকভাবে জটিল অবস্থায় ফেলেছে।
ইসরায়েল যদিও দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার দাবি করেনি। তবে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাত্জ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আরও অবাক করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবারের অন্যান্য ঘটনার মধ্যে, ইউনাইটেড কিংডম মারিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানায় যে, পারস্য উপসাগরে একটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। কাতারের রাস লাফান থেকে প্রায় ৪ নটিক্যাল মাইল (৭ কিমি) দূরে এই হামলা হয়।
সূত্র: আলজাজিরা

