টাকা দিচ্ছেন না ট্রাম্প, বিপাকে মামদানি

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি গত ৩১ মার্চ ম্যানহাটনে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বকেয়া অর্থ পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্রের অনীহার কারণে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে জাতিসংঘ। যার প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই নয়, পড়তে পারে নিউইয়র্ক সিটিতেও। এতে সিটির মেয়র জোহরান মামদানি আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। স্থানীয় সময় গত রবিবার (৪ এপ্রিল) মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাতিসংঘের পাওনা প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সদস্য ফি। এই বিপুল বকেয়া এবং অন্যান্য দেশের অপরিশোধিত অর্থ ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংস্থাটির আর্থিক ধসের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে। দীর্ঘদিন ধরে শহরটি বিভিন্ন আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে জাতিসংঘের ভৌত স্থাপনায় ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে জাতিসংঘের বাজেট সংকট অব্যাহত থাকলে, নিউইয়র্ক সিটিকে এই আর্থিক দুরবস্থার দায় নিতে হতে পারে। কারণ মামদানির পূর্বসূরি এরিক অ্যাডামসের সময় করা একটি চুক্তি সিটিকে দায় বহনের ফাঁদে ফেলতে পারে।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ উন্নয়ন করপোরেশন। এটি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য অফিস স্পেস ভাড়া দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। গত বছর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের পাশের দুটি ভবন সংস্কারের জন্য ৩৬৫ মিলিয়ন ডলারের বন্ড ইস্যু করে। চুক্তিটি কার্যকর করতে অ্যাডামস প্রশাসন বছরে ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক গ্যারান্টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। অর্থাৎ যদি কোনো অফিস খালি থাকে বা ভাড়া না পাওয়া যায়, শহর সেই খরচ বহন করবে।
এর ফলে জাতিসংঘ যদি ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার দিতে বাধ্য হবে নিউইয়র্ক সিটি। ইতোমধ্যে শহরটি ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির মুখে রয়েছে। যা মামদানির প্রগতিশীল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করছে।
জাতিসংঘ-সম্পর্কিত অফিস স্পেসের চাহিদাও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। উচ্চ ব্যয়ের কারণে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জনবল সরিয়ে নিচ্ছে। এরইমধ্যে একটি সংস্থা সম্প্রতি ৪০০ কর্মীকে নিউইয়র্ক থেকে মাদ্রিদ ও জার্মানির বন শহরে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন করপোরেশনের বোর্ড সদস্য এবং সাবেক কংগ্রেস সদস্য ক্যারোলিন মালোনি বলেছেন, জাতিসংঘের অর্থ ফুরিয়ে গেলে বড় সংকট তৈরি হবে। তাই কংগ্রেসের উচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বকেয়া অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া। তিনি জানান, এটি শুধু জাতিসংঘের জন্য নয়, নিউইয়র্ক সিটির অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে সন্তুষ্ট রাখতে উন্নয়ন করপোরেশন যে বন্ড ইস্যু করেছে, তা দিয়ে ১ ও ২ ইউএন প্লাজার ভবন দুটি সংস্কার করা হচ্ছে। এসব অফিস স্পেস প্রতি বর্গফুট ৫১ ডলারে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এটি বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম।
করপোরেশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল কাউন্সেল রব কোল বলেছেন, নিউইয়র্কের জন্য জাতিসংঘ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বিবেচনায় নিয়েই নগর সরকার জাতিসংঘ বন্ডে ডিফল্ট করলে সেই দায় নিতে রাজি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি খুব কঠিন রিয়েল এস্টেট বাজারের মধ্যে ছিলাম। আর বাণিজ্যিক অস্থিরতার মধ্যেও নগর সরকার এগিয়ে এসেছে।’
জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান আজিজ হক জানিয়েছেন, তারা তাদের সব আইনি বাধ্যবাধকতা পালন করছেন। ভবিষ্যতেও এটি করবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তবে তিনি নিশ্চিত এই সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করতে পারবেন। জাতিসংঘ অনরোধ করলে অন্যদেশগুলোকে অর্থ দিতে রাজি করাতে পারেন।
বর্তমানে মামদানির প্রশাসন বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গুতেরেসের টিম নিউইয়র্ক সদর দপ্তর বন্ধের হুমকি দিচ্ছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এ বিষয়ে কোল জানান, মেয়রের বাজেট ব্যবস্থাপনা অফিস উন্নয়ন করপোরেশনকে ফোন করে খোঁজ নেয়।
গত ৩১ মার্চ মামদানি নিজেও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের পাঠানো সেই বৈঠকের বিবরণীতে গুতেরেস নিউইয়র্ক শহরের উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা ও সম্পর্কের প্রশংসা করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কথা তিনি উল্লেখ করেননি।
ওয়াশিংটনে জাতিসংঘকে প্রায়ই রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে নিউইয়র্কে মেয়ররা একে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বড় নিয়োগদাতা হিসেবে দেখেন। এক দশক আগে একটি অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাতিসংঘের উপস্থিতি নিউইয়র্কে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে।
সম্প্রতি মামদানি শহরের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিশনার আইসাতা এম.বি. কামারাকে সরিয়ে তার জায়গায় আনা মারিয়া আর্চিলাকে নিয়োগ দেন। তিনি ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টি ও অভিবাসী অধিকার সংগঠন মেক দ্য রোড নিউইয়র্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গত ৩১ মার্চ জাতিসংঘে বৈঠকে মেয়রের সঙ্গে ছিলেন আর্চিলা। তিনি জানান, মামদানি পুরো কথোপকথনটাই জাতিসংঘকে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়ে কাটিয়েছেন। শক্তিশালী দেশগুলো যখন তাদের দায় পরিশোধ করে না, তখন একটি আর্থিক সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য।
তবে আপাতত জাতিসংঘের নিউইয়র্ক ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের বোর্ড সদস্য ও সাবেক কাউন্সিলম্যান জো বোরেলি রসিকতা করে বলেছেন, জাতিসংঘে সামান্য পরিবর্তন করতেও ১৯০ দেশের অনুমোদনের দরকার হয়। তারা এত সহজে সদর দপ্তর সরাবে, এমনটা ভাবা কঠিন।
মামদানি সম্প্রতি সাবেক কূটনীতিক এমেরিটা টরেসকে ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি জর্জ ক্লাইনের স্থলাভিষিক্ত হন। ৫৪ বছর ধরে এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গভর্নর নেলসন রকফেলার প্রথম ক্লেইনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরে মেয়র রুডি গিউলিয়ানি ও পরবর্তী সব মেয়র তাকে পুনঃনিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি ডিসেম্বরে পদত্যাগ করেন।
বিদায়ী বক্তব্যে ক্লাইন নতুন প্রধানকে পরামর্শ দেন, গণমাধ্যম থেকে দূরে থাকবেন। তবে তার এই মন্তব্যের পরপরই এক কর্মী মনে করিয়ে দেন—সেখানে একজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: পলিটিকো



