ইউরোপে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক, মনোযোগ বাড়িয়েছে চীন

ছবিঃ আগামীর সময়
২০২৬ সালের শুরু থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি ১২ থেকে সাড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর বাংলাদেশ থেকে কমিয়েছে ২৫ শতাংশ। অর্থ্যাৎ অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা প্রায় দ্বিগুন কমিয়েছে ইইউ।
এই অবস্থায় ইউরোপের বাজারে মনোযোগ বাড়িয়েছে চীন। মূলত আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এই বাড়তি মনোযোগ। একসময় উচ্চমূল্যে পোশাক বিক্রি করা চীন এখন ইউরোপে পোশাক রপ্তানি করছে বাংলাদেশের চেয়েও কম মূল্যে। ফলে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আয় কমলেও রপ্তানি কমেনি দেশটির।
চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০ মার্চ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট। সংস্থাটির মার্চ মাসের প্রতিবেদন প্রকাশ পাবে ২০ এপ্রিল। এমন এক সময়ে এই তথ্য এলো যখন জ্বালানি সংকট নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। আর আগামী চারমাস এই সংকট কিভাবে সামাল দিবে ঢাকা, তার একটি রোডম্যাপ চেয়েছে বিদেশি ক্রেতারা।
ইউরোস্ট্যাটের প্রতিবেদন সম্পর্কে এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেছেন, ‘বিশ্ববাজার থেকে পোশাক কেনা কমলে প্রপোরশনালি বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে। উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে আমরা কিভাবে এই প্রভাবটা সহনীয় পর্যায়ে নিতে পারি।’
ইউরোপ বিশ্ববাজার থেকে পোশাক কেনা কমানোর বেশ কিছু কারণ দেখিয়েছে ইউরোস্ট্যাট। এরমধ্যে অন্যতম- ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পোশাক পণ্যের অতিরিক্ত মজুত, কমদামি পোশাক কেনায় ঝোঁক, ইউরোপের বাজার দখলে চীনের আগ্রাসী তৎপরতা। ইউরোস্ট্যাট আভাস দিয়েছে যে, আগামী মে মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এই নিম্নমুখি ধারা। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট (সামার সিজন) থেকে অর্ডার কিছুটা বাড়তে পারে, তবে সেটিও নির্ভর করছে বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার ইউরোপ। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত ২৭ দেশে। বাংলাদেশের রপ্তানির তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ইউরোপের সম্মিলিত বাজারের তুলনায় তা অনেক কম। ফলে ইউরোপীয় বাজার এখনও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বড় গন্তব্য।
ইউরোস্ট্যাটের হিসাবে, ২০২৫ সালে ইউরোপের বাজারে ১৯.৪১ বিলিয়ন ইউরোর (২১ বিলিয়ন ডলার) পোশাক রপ্তানি করে ৫.৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছিল বাংলাদেশ। সেখানে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেই বাজারে রপ্তানি কমেছে ২৫.২৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ইউরোপে পোশাক পাঠিয়েছিল ১.৯১ বিলিয়ন ইউরোর। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪৩ বিলিয়ন ইউরোতে। পোশাকের দাম কমার সঙ্গে রপ্তানির পরিমাণও কমেছে ১৭.৪৯ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারি মাসে ইউরোপ বিশ্ববাজার থেকে পোশাক কেনা কমিয়েছে ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমানো ২৫ শতাংশ পণ্য চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্কের মতো দেশ থেকে কমমূল্যে সংগ্রহ করতে চাইছে ইউরোপ।
বাংলাদেশ কেন পোশাকের দাম কমাতে না পারছে না এ বিষয়ে এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেছেন, ‘বিদেশি ক্রেতারা কমিশন চাইলে ভারত যেভাবে ছাড় দিতে পারবে আমরা সেভাবে পারবো না। কারণ নিজস্ব তুলা দিয়ে পোশাক তৈরি করছে ভারত। আমরা তো তৈরি করছি আমদানির মাধ্যমে। ফলে ভারতের মতো সেভাবে ছাড় দিতে না পারলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বো আমরা।’
তার ভাষ্য, ‘সরকার চাইলে উত্তরণ করা যাবে এই সংকট। এজন্য কারখানা চালাতে বাড়াতে হবে সরকারি প্রণোদনা। একইসঙ্গে জ্বালানি সংকট দূর করা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা আবশ্যক। এগুলো করতে পারলে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা যাবে পোশাক খাতকে।’
অর্ডার কেন কমলো
ইউরোপে মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ২.৪ শতাংশ- ২.৬ শতাংশ এর ঘরে। তবে খাদ্য এবং জ্বালানির দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মানুষের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও খাবারে। ফলে সবার আগে কাটা পড়ছে পোশাক বা জুতার মতো শৌখিন পণ্যের বাজেট। এতে করে ইউরোপের খুচরা বাজারে পোশাক বিক্রির পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ১১.৫ শতাংশ। ইউরোপীয় ভোক্তাদের প্রায় ৩৭ শতাংশ জানিয়েছেন, এখন খুব জরুরি না হলে নতুন পোশাক কিনছেন না তারা।
এছাড়া, ২০২৪-২৫ সালে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করেছিল ব্র্যান্ডগুলো। ইউরোস্ট্যাটের রিটেইল ইনডেক্স অনুযায়ী, বড় ব্র্যান্ডগুলোর গুদামে এখনও রয়ে গেছে ১৮-২০ শতাংশ অবিক্রিত পণ্য। এই ‘ইনভেন্টরি কারেকশন’ বা পুরোনো মজুত খালি না হওয়া পর্যন্ত নতুন অর্ডার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছেন তারা।
ইউরোস্ট্যাটের রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ইউরোপে পোশাকের গড় ইউনিট প্রাইস (প্রতি কেজি পণ্যের দাম) প্রায় ৭.৭৬ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পতন আরও তীব্র (৯.৪১ শতাংশ)। ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন দামী পোশাকের বদলে খুঁজছেন সস্তা পোশাক। এই সস্তা পোশাক কিনতে ইউরোপিয় ক্রেতারা নানা অজুহাতে ডিসকাউন্ট চাচ্ছেন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর।
এরমধ্যে যোগ হয়েছে চীনা পণ্যের আগ্রাসন। মার্কিন বাজারে শুল্ক বাধার মুখে পড়ে চীন এখন তাদের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে গেছে ইউরোপের বাজার। তারা বাজার ধরে রাখতে সেই পণ্য বিক্রি করছে নামমাত্র লাভে। এর প্রমাণ মিলে চলতি বছরের শুরুতে চীনের রপ্তানি আয়ে। দেশটির রপ্তানি আয়ে ৬.৯ শতাংশ কমলেও ঠিক রয়েছে রপ্তানির পরিমাণ। অর্থাৎ তারা কম দামে পণ্য দিয়ে ছিনিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশের অনেক ‘বেসিক’ অর্ডার।
কোন দেশে যাচ্ছে অর্ডার
ইউরোস্ট্যাটের ডাটা বলছে, বাংলাদেশ থেকে যে ২৫ শতাংশ অর্ডার কমেছে, তার একটি বড় অংশ যাচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম এবং তুরস্কের দখলে। এই বাজার দখলে বিশেষ কৌশল নিয়েছে। আর ভিয়েতনাম ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের কারণে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে ইউরোপে, যা বাংলাদেশের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দিচ্ছে দেশটিকে। অন্যদিকে তুরস্ক ভৌগোলিক সুবিধার কারণে সড়কপথেই দ্রুত ইউরোপে পৌঁছে দিচ্ছে পণ্য। আর দীর্ঘ পথ ঘুরে যাচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য।



