বিকল্প রুটে সৌদি আরব থেকে আসছে জ্বালানি তেল

সৌদি আরব থেকে জাহাজে করে চট্টগ্রামে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আসে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ঘিরে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ আছে। এই অবস্থায় হরমুজ এড়িয়ে এই প্রথম বিকল্প রুট ব্যবহার করে আনা হচ্ছে জ্বালানি তেল।
এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বোঝাই জাহাজটি ‘এমটি নিনেমিয়া’। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২১ এপ্রিল রওনা দিয়েছে। ৫ মে নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই তেল নিরাপদে সঠিক সময়ে চট্টগ্রাম পৌঁছলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারি পুণরায় চালু হবে। আর বিকল্প রুট দিয়েই ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল চট্টগ্রামে পৌঁছবে।
একইসঙ্গে সংযুক্ত আরব-আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকেও বিকল্প রুট ব্যবহার করে জ্বালানি তেল আনার চিন্তা করছে সরকার।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে জ্বালানি তেল সরবরাহের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলছেন, ‘ইয়ানবু বন্দরের অবস্থান হচ্ছে লোহিত সাগরের উপকূলে। সেই বন্দর থেকে তেল আনতে হরমুজ পাড়ি দিতে হয় না। ইয়ানবু থেকে জাহাজটি লোহিত সাগর হয়ে সরাসরি বাব-আল মান্দেব প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করবে এবং এরপর বঙ্গোপসাগর দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে। এই পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে জাহাজটির সময় লাগবে প্রায় ১২ থেকে ১৫ দিন। সে হিসেবে আগামী ৫ মে জাহাজটি চট্টগ্রামে নোঙর করার কথা।’
কিন্তু সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল জাহাজে বোঝাই করে চট্টগ্রামে আনতে গেলে সময়, দুরত্ব, অর্থ সবকটাই বেশি লাগবে বলে মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীর মতে, ইয়ানবু বন্দর থেকে বিকল্প রুট ব্যবহার কের তেল আনতে গেলে জাহাজকে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার নটিক্যাল মাইল বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হবে। এই বাড়তি দূরত্বের কারণে যাত্রা শেষ করতে প্রায় ৩ থেকে ৫ দিন বাড়তি সময় লাগবে। এখন সৌদি সরকারের সঙ্গে আমাদের কী চুক্তি আছে সেটি দেখার বিষয়।
জ্বালানি খাতের বেসরকারি এক আমদানিকারক বলছেন, আমরা সৌদি আরব থেকে তেল আনি রাস তানুরা বন্দর থেকে। এই বন্দর ঘিরেই সব তেলের মজুদ। সৌদি আরবের আরামকো নিজেই এই বন্দর পরিচালনা করে। সৌদির মোট তেলের ৯০ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে করা হয়ে থাকে।
এখন পশ্চিমা উপকূলের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল পাঠাতে গেলে প্রথমে তেল ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে ইয়ানবু নিতে হবে। এখন নতুন রুট দিয়ে আনতে গেলে সৌদি আরব বাড়তি মাশুল আরোপ করে কিনা আমি জানি না।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম মনে করেন, রাস তানুরা থেকে আনা সাশ্রয়ী-সহজ হলেও এই মূহুর্তে ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল আনার কোনো বিকল্প নেই। আমার রিফাইনারি বন্ধ। এটি চালু না করে রেডিমেড বা পরিশোধিত তেল বেশি দামে আমদানির চেয়ে ইয়ানবু থেকে কিছু বাড়তি পরিবহন ভাড়া দিয়ে হলেও লাভজনক হবে।
বাংলাদেশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনে সৌদি আরবের আরামকো এবং আবুধাবির এডনক কম্পানি থেকে। দুটি কম্পানি থেকে বছরে জিটুজি চুক্তিতে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনে। সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রামে তেল আসে পারস্য উপসাগরের ‘রাস তানুরা’ বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় রাস তানুরা বন্দরে বাংলাদেশি এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বোঝাই জাহাজ আটকা পড়েছে। আর এই তেল না পেয়ে গত ১৪ এপ্রিল বাধ্য হয়ে বন্ধ করা হয় ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল উৎপাদন কার্যক্রম। উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশের যোগান কমে যায়। এতে তেলের সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাধ্য হয়েই চড়াদামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
জ্বালানি তেল আসা ঘিরে তেল শোধনাগার চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে সরকারি ইস্টার্ন রিফাইনারি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাতের ভাষ্য, সঠিক সময়ে অপরিশোধিত তেল পৌঁছালে পরিশোধন কার্যক্রম পুণরায় চালু করতে পারবে। সেই প্রস্তুতি আমাদের আছে। শোধনাগার চালু করতে পারলে সংকট আমরা ভালো যোগান দিতে পারবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। পূর্ণ সক্ষমতায় চললে এটি প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। দিনে ৪ হাজার ৫০০ টন তেল পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রায় ১৭শ টন ডিজেল। ১১শ টন ফার্নেস অয়েল। ৫শ টন পেট্রোল ও অকটেন। জেট ফুয়েল উৎপাদন করে প্রায় ৪০০ - ৪৫০ টন। বিটুমিন উৎপাদন করে প্রায় ৩০০ টন। এলপিজি উৎপাদন ৭০ টনের মতো।



