যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের ঘরে ঘরে, দিশেহারা মানুষ

ফাইল ছবি
ভোর না হতেই পতেঙ্গার তেলের ডিপোগুলোর সামনে ট্রাকের দীর্ঘ সারি। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকগুলো নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে ভেতরে কোথাও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই অচলাবস্থা শুধু বন্দরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে প্রতিটি ঘরে।
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আগের মতো তেল-গ্যাস আমদানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। এর সংকটে পড়েছে সারা দেশের মানুষ।
সংকটের সূত্রপাত চট্টগ্রাম বন্দরে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে সময়মতো পণ্য খালাস করতে পারছে না লাইটার জাহাজগুলো। আগে যেখানে একটি জাহাজ থেকে ভোজ্যতেল বা চিনি খালাসে তিন থেকে চার দিন লাগত, এখন লাগছে ১০ থেকে ১২ দিন। এতে প্রতিদিন জাহাজ প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত যুক্ত হচ্ছে পণ্যের দামে।
বন্দর থেকে পণ্য যখন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আড়তে পৌঁছায়, তখন যুক্ত হয় আরেক দফা পরিবহন ব্যয়। আবার এরই মধ্যে ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এক ট্রাক পণ্য পাঠাতে যেখানে ১৫ হাজার টাকা লাগত, এখন লাগে ২২ হাজার। ফলে চাল-ডাল-তেল সবকিছুর ওপরই পড়ছে এই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব।
এই চাপের প্রভাব স্পষ্ট। এক বছর আগেও যে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ১৯৫ টাকা। খোলা পাম অয়েলের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা। চিনির দাম একশ টাকার নিচ থেকে এখন ১৪৫ টাকায় পৌঁছেছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবারের মাসিক খরচে। আগে যেখানে চার সদস্যের একটি পরিবারের বাজার খরচ ৮ থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বেড়ে পৌঁছেছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, মাসে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে। কিন্তু আয়ের কোনো পরিবর্তন না থাকায় এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার বাসিন্দা শরিফুল আলম সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। ৪২ হাজার টাকার বেতনে চার সদস্যের পরিবার চালাতে এখন তিনি দিশেহারা। ‘আগে মাসে ৯ হাজার টাকায় বাজার হয়ে যেত, এখন ১৪ হাজারেও কুলায় না। বাচ্চাদের জন্য প্রতিদিন একটা করে ডিম ছিল, এখন দুইজন মিলে একটা খায়। বাজারের ব্যাগ হালকা হয়, কিন্তু খরচ বাড়তেই থাকে,’ বলছিলেন তিনি।
এদিকে বেড়েছে রান্নার খরচও। এলপিজি গ্যাসের একটি সিলিন্ডার কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৯০০ টাকা। যা এক বছর আগে ছিল ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকার মধ্যে।
সবজি বাজারও বেশ চড়া। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার ও বহদ্দারহাটের পাইকারি আড়তগুলোতে ভোরের আলো ফোটার আগেই যে কর্মতৎপরতা দেখা যেত, জ্বালানি সংকটে সেখানেও পড়েছে বড় ধরনের ভাটা। ট্রাক ভাড়া এক লাফে কয়েক হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা সবজির প্রতি কেজিতে এখন যুক্ত হচ্ছে ‘পরিবহন কর’।
সবজি ব্যবসায়ী আবদুল কাদের জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গ কিংবা সীতাকুণ্ডের আড়ত থেকে আসা সবজির ট্রাক ভাড়া ডিজেলের দাম বাড়ার পর থেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন। আগে যে ট্রাক ভাড়া ছিল ১২ হাজার টাকা, তা এখন ১৮ হাজার টাকা। এই বাড়তি ভাড়ার অংকটি সরাসরি গিয়ে ঠেকছে ভোক্তার পকেটে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।



