‘একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে মশার উৎপাত’

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
‘একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে মশার উৎপাত। সবকিছু মিলে বিষিয়ে তুলছে জীবন।’
এভাবেই বিদ্যুৎবিভ্রাট নিয়ে ক্ষোভ জানালেন চট্টগ্রাম নগরীর কল্পলোক আবাসিক এলাকার গৃহিণী আয়েশা সিদ্দিকা। দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না বলে গৃহিণীর অভিযোগ।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের চিত্র বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে সেই অভিযোগের সত্যতা। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে লোডশেডিং বেড়েছে পাঁচগুণ।
একদিকে বৈশাখের খরতাপ। অন্যদিকে লোডশেডিং। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে চট্টগ্রামের জনজীবনে। এরই মধ্যে আগামীকাল থেকে শুরু এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। লোডশেডিংয়ের কারণে পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও ব্যাঘাত ঘটছে বলে অভিযোগ পরীক্ষার্থীদের।
৫ গুণ বেড়েছে লোডশেডিং
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, গত ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে সর্বনিম্ন লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল ৫৪ মেগাওয়াট। এর ঠিক ১১ দিনের মাথায় ১৪ এপ্রিল লোডশেডিং দাঁড়ায় ২৮২ মেগাওয়াটে। অল্প সময়ের মধ্যে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ২২ গুণ। অবশ্য সে সময় চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদনও ছিল কম।
যেখানে গত ৪ এপ্রিল সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৪০৮ মেগাওয়াট, সেখানে ১৪ এপ্রিল উৎপাদন নেমে আসে মাত্র ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াটে, যা অর্ধেকেরও কম। গত ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয় ১ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট, লোডশেডিং ১৪৮ মেগাওয়াট। মাসের শুরুর তুলনায় এ হিসাব প্রায় তিনগুণ।
এ বিষয়ে জানাচ্ছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ। ‘প্রায় প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার ৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কম পাচ্ছি। তাই বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে লোডশেডিং।’
নাগরিক দুর্ভোগ চরমে
বিদ্যুতের এই অনিয়ন্ত্রিত আসা-যাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে দুপুরের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ এবং রাতের ঘুমের সময় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং বিষিয়ে তুলেছে জনজীবনকে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার গৃহিণী রোকসানা আক্তারের অভিযোগ, ‘রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। মশার জন্য দরজা-জানালাও খোলা রাখা যায় না। গরমে সন্তানদের নিয়ে বাসায় দমবন্ধ অবস্থায় রাত কাটাতে হয়। সন্তানরা ঘুমাতে না পেরে কান্নাকাটি করে। ব্যাঘাত হচ্ছে পড়াশোনায়ও।’
অন্যদিকে, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও করুণ। আইপিএস বা জেনারেটর ব্যবহার করেও মোকাবিলা করা যাচ্ছে না এই দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সেলিম জানাচ্ছিলেন, ‘ভবনে আছে জেনারেটর। কিন্তু যেভাবে বারবার বিদ্যুৎ যায়, সেটা জেনারেটর দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হলে চালানো যায়। আবার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না চাহিদামতো তেল।’
বিদ্যুৎ নিয়ে শঙ্কিত এসএসসি পরীক্ষার্থীরা
পরীক্ষার মুহূর্তে এসে তীব্র লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে পরীক্ষার্থীরাও।
নগরীর উত্তর কাট্টলীর প্রভাতী মাধ্যমিক শিক্ষা নিকেতনের পরীক্ষার্থী রবিউল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করছিল, ‘কাল পরীক্ষা শুরু। অথচ আজ সারা দিন বিদ্যুতের যন্ত্রণায় ভালোভাবে পড়তে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে গরমে।’
আরেক পরীক্ষার্থী নাফিজার দাবি, লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো নেওয়া হচ্ছে না পরীক্ষার প্রস্তুতি।
বাড়তি উৎপাদন করেও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না চট্টগ্রাম
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে মোট ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গ্যাস, জ্বালানি ও কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় গত ২ এপ্রিল বন্ধ ছিল পাঁচটি কেন্দ্র। এদিন ২৩টি কেন্দ্র উৎপাদন করেছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২১৭ মেগাওয়াট।
একই সময়ে ১ হাজার ৪৫২ দশমিক ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বিপরীতে পেয়েছিল ১ হাজার ৩৭৬ মেগাওয়াট। সর্বশেষ গত ১৮ এপ্রিল ২০টি কেন্দ্র উৎপাদন করেছে ২ হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ পেয়েছে ১ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানাচ্ছিলেন, ‘চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হওয়া বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। তা সরাসরি চট্টগ্রামে ব্যবহারের সুযোগ নেই। জাতীয় গ্রিড থেকে যেটি বিতরণ করা হয়, সেটিই পায় চট্টগ্রামের বাসিন্দারা।’
একে একে বন্ধ হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র
এপ্রিলের শুরুতে চট্টগ্রামে মোট ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ২৩টি কেন্দ্র দিনের কোনো না কোনো সময়ে চালু ছিল। সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল বাকি পাঁচটি কেন্দ্র (কাপ্তাই ইউনিট-৩, ৪, ৫ এবং রাউজান-১ ও ২)। গত ১৮ এপ্রিল সচল কেন্দ্রের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৯টিতে। এদিন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল ৯টি কেন্দ্র। মাসের শুরুতে ৩ হাজার ২১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও ১৮ এপ্রিল উৎপাদন হয় ২ হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের মধ্যে আশার আলো দেখিয়েছিল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। কিন্তু সেখানেও কমেছে উৎপাদন। সর্বশেষ বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার উৎপাদন করেছে সর্বোচ্চ ৫৮৬ মেগাওয়াট। দুই সপ্তাহ আগে কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্রের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৬৪ মেগাওয়াট।
বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর তালিকায় রয়েছে দীর্ঘদিনের অচল রাউজান-১ ও রাউজান-২ (২১০ মেগাওয়াট প্রতিটি)। এ ছাড়া সচল কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে মাত্র দুটি (ইউনিট ২ ও ৫)। বাকি ইউনিট-১, ৩ এবং ৪ পানির স্তর কমে যাওয়ার কারণে পুরোপুরি বন্ধ। বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলোর মধ্যে জুডিয়াক, জুলদা-২ এবং জুলদা-৩ থেকে উৎপাদন হচ্ছে না বিদ্যুৎ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে নেতিবাচক প্রভাব। যেমন, ১৮ এপ্রিল বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারেনি টেকনাফ সোলার কেন্দ্রটি।



