বড় মেয়ে পানিতে, ছোটটি গেল হামে

হাসপাতালে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে বিষাদময় দৃশ্য
‘আমার পরান পাখি। তুই কেমনে আমাকে ফেলে চলে গেলি। আমি তো সহ্য করতে পারছি না রে মা। আমার এমন কেন পোড়া কপাল। কেন তোকে বাঁচাতে পারলাম না পরান। আমাকেও নিয়ে যেতি।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের দ্বিতীয়তলায় শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (পিআইসিইউ) সামনের বারান্দায় এভাবে বিলাপ করছিলেন তৃষ্ণা পাল। একটু আগে সেখানে মারা গেছে তার মেয়ে নিলাদ্রী। হামের উপসর্গ নিয়ে ২৬ এপ্রিল ভর্তি হয়েছিল। এর আগে এক সপ্তাহ কক্সবাজার হাসপাতালে ছিল ১১ মাস বয়সী শিশুটি।
হামের উপসর্গ নিয়ে মঙ্গলবার চমেক হাসপাতালটির শিশু বিভাগ, হাম ওয়ার্ড ও পিআইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছিল ১০৯ শিশু। সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সেখানে মারা যায় তিন শিশু। নিলাদ্রী পাড়ি জমিয়েছে দুপুরে। এভাবে প্রতিদিন সেখানে তৈরি হচ্ছে বিষাদময় দৃশ্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩১৭ শিশুর। মৃত্যুর মিছিলে গত ২৪ ঘণ্টায় যোগ হয়েছে আরও ৬ শিশু। এর মধ্যে দুই শিশুর হাম নিশ্চিত হয়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত ৪২ হাজার ৯৭৯ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে।
হাসপাতালের বারান্দায় আর্তনাদ করে চলেছেন তৃষ্ণা। পাশে তার শাশুড়ি শিল্পী পালও কাঁদছেন নাতনির জন্য। স্বামী মিঠু পাল বিমর্ষ চেহারায় হাসপাতালে মেয়ে ও নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। মেয়ে না থাকলেও বাড়ি তো ফিরতে হবে। গত ১০ দিনে মেয়েকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি। লড়াইয়ে ব্যর্থ মিঠু এখন ক্লান্ত প্রাণ।
কী হয়েছিল এমন প্রশ্নে যেন মিঠুর বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট কান্না হয়ে ঝরল, ‘আমার মেয়ের হাম হয়েছিল। কক্সবাজার থেকে এখানে পাঠিয়েছিল আইসিইউর জন্য। কিন্তু পাইনি। পরশু দিন রবিবার পিআইসিইউতে দেওয়া হয়। আজ ১টা ২০ মিনিটে মেয়ে চলে যায়।’
কক্সবাজারের চকরিয়ার হারবাং এলাকার বাসিন্দা মিঠু পাল। গ্রামে টেইলার্সের কাজ করেন। মেয়ের হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ২০ দিন আগে। মেয়েকে বাঁচাতে ঘুরেছেন কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম। মিঠুর মা-বাবাসহ চমেক হাসপাতালে পালা করে পাহারা দিয়েছেন। কিন্তু বাঁচানো গেল না।
ছেলেমেয়ে কজন এমন জিজ্ঞাসায় মিঠু এবার আরও ভেঙে পড়লেন, ‘আমার দুই বছর বয়সী বড় মেয়ে দেড় বছর আগে বাড়িতে পানিতে পড়ে মারা যায়। এরপর নিলাদ্রীর জন্ম। এবার চলে গেল শেষ সম্বল।’
কে কাকে সান্ত্বনা দেবে! মিঠু, স্ত্রী তৃষ্ণা, মা শিল্পী সবাই কাঁদছেন। একপর্যায়ে আর্তনাদরত স্ত্রীকে জড়িয়ে নিজেদের কপালকে দুষছেন দুজন, ‘সাথে সাথে আইসিইউ পেলে হয়তো বেঁচে যেত আমাদের মেয়ে। কেন ঈশ্বর আমাদের এমন শাস্তি দিল!’
হাসপাতাল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তৃষ্ণার শ্বশুর বাবুল পাল। গুছিয়ে নিচ্ছিলেন শিশু নিলাদ্রীর জামা, ফিডারের বোতলসহ টুকিটাকি। মেয়ের জামা দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি মা। জামায় যে মেয়ের গন্ধ আছে, ফিডারে ঠোঁটের ছোঁয়া। সেসব বুকে জড়িয়ে নিলেন তৃষ্ণা। কান্না করতে করতে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার। পানি এগিয়ে দিলেও তা মুখে তুলছেন না তৃষ্ণা, ‘আমার মেয়ে আইসিইউতে আমার দুধ খেতে পারেনি। পানিও খেতে পারেনি। আমি এখন কেমনে পানি খাই!’
সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এলো। এবার ফেরার পালা। সাদা কাপড়ে মোড়ানো নিলাদ্রীকে কোলে নিয়ে পিআইসিইউ থেকে বের হয়ে এলেন এক স্বজন। মেয়ের নিথর দেহ জড়িয়ে আরেকবার চোখের জলে ভাসলেন তৃষ্ণা। মায়ের কোলে সন্তানের লাশ। এরপর সাইরেন বাজিয়ে ছুটল চকরিয়ার উদ্দেশে, নিলাদ্রীর শেষযাত্রা।





