আগামীর সময়

শ্যামা সুন্দরীর গর্ভে মশার প্রজনন, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

শ্যামা সুন্দরীর গর্ভে মশার প্রজনন, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

ছবিঃ আগামীর সময়

নগরীর ঐতিহ্যবাহী শ্যামা সুন্দরী খাল এখন মশা প্রজননের গর্ভ। মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা ভেবে খনন করা এই খাল রোগ বালাইয়ের বড় ভাবনা।

খালটির পানি বিষাক্ত। যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর দুষণের ক্ষত নিয়ে থাকা খালটির সংস্কারের নামে হয়েছে হরিলুট।

১৬ কিলোমিটার লম্বা শ্যামাসুন্দরী খালের সামনে সেনপাড়া, মুলাটোল, তেঁতুলতলা, নূরপুর, বৈরাগীপাড়া হয়ে মাহিগঞ্জের মরা ঘাঘটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

‘বর্তমানে খালটি হারিয়েছে তার নাব্য। দুই ধার দখলে ব্যাহত পানি প্রবাহ। শুধু তাই নয়: স্থানীয়রা খালে ফেলছেন মল-মূত্রসহ বিভিন্ন বর্জ্য। ফলে বড় খাল ভরাট হয়ে পেয়েছে ডোবা-নালার রূপ’, বলছিলেন খালের পাড়ে এক বাসিন্দা।

খালটির সৌন্দর্য বৃদ্ধিসহ দূষণমুক্ত করতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও শ্যামাসুন্দরীর আসল রূপ ফেরানো যায়নি। মশা-মাছির আবাসস্থলে হওয়া শ্যামাসুন্দরী ছড়াচ্ছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব।

রংপুর সিটি করপোরেশনের সংগে যুক্ত কর্তাব্যাক্তিদের ভাষায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে রংপুর অঞ্চলের মহারাজা জানকী বল্লভ সেনের মা শ্রীমতি শ্যামাসুন্দরী সেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখাসহ ম্যালেরিয়া দূর করার জন্য দীর্ঘ এই খাল খনন করেন মহারাজা জানকী বল্লভ সেন। ওই সময় খালটি মূলত ঘাঘট নদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে খনন করা হয়। ১৮৯৪ সালে খননের পর থেকে শ্যামাসুন্দরী খালটি সংস্কারের আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০১২ সালে রংপুর পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর ওই বছরই খালটি সংস্কার ও এর সৌন্দর্য বাড়াতে ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার, যোগ করেন তারা।

নগরীর ইঞ্জিনিয়ারপাড়া এলাকার আশরাফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করলেন খুব। তার বাখ্যা, সারাবছর খাল সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই।

“রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে দু’একদিন ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ নামে ওষুধ স্প্রে করা হয়। তাও নগরীর সব এলকায় নয়। সামনে এডিস মশার প্রজননকাল আসছে। ভয় পাচ্ছি,” উৎকণ্ঠা আশরাফুলের।

সেনপাড়ার শিউলি বেগমও একই ভয়ে আছেন। জানালেন, বর্ষাকালে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে শ্যামাসুন্দরী খালের নোংরা পানি। অন্যদিকে মশার প্রাদুর্ভাব তো আছেই। একই আতংক বোধ করছেন রাধাবল্লভ এলাকার হাসি বেগম।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদের ভাষ্য, শ্যামা সুন্দরী খাল হলো রংপুর মহানগরীর পানি নিস্কাশনের একমাত্র মাধ্যম। এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দিন দিন বেদখল হচ্ছে জায়গা। এর মধ্যে প্রশাসন ৭০ জনকে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করলেও কাজের আর অগ্রগতি হয়নি।

‘শ্যামাসুন্দরীকে পুনঃখনন করে পানিপ্রবাহ বাড়ানো না গেলে পুরো নগরবাসী চরম বিপদে পড়বেন, নগরজুড়ে সারাবছর সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতার’, আশঙ্কা ড. ওয়াদুদের।

নগরীতে গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৫৮৬ জন। এর মধ্যে দুইজন মারা গেছেন। চলতি বছরও রয়েছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অনেকে’ তথ্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট শিরীনা আখতারের।

রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের খতিয়ান বলছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন কার্যক্রম চলমান তবে সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডে নয়, সাবেক পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ড (শহরকেন্দ্রিক) পাচ্ছে বেশি গুরুত্ব। উড়ন্ত মশা দমনে এডাল্টিসাইড (ম্যালাথিওন) এবং মশার লার্ভা দমনে লার্ভিসাইড (টেমিফস ৫০ ইসি) জাতীয় ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের দাবি, গত বছর উড়ন্ত মশা দমনে ৭২০০ লিটার এবং মশার লার্ভা দমনে ১২০ লিটার ওষুধ স্প্রে হয়েছে।

তবে এসব কার্যক্রম যে কোনো কাজে আসছে না তা জোর দিয়ে বলছে এলাকাবাসী।

যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন বললেন ‘প্রক্রিয়া চলমান’।

দায়সারা উত্তরের কথা মনে করিয়ে দিলে তার বাখ্যা, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশন কাজ করছে। চলতি বছর ২ হাজার লিটার এডাল্টিসাইড স্প্রে করার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ১০ হাজার লিটার এবং ৫০০ লিটার লার্ভিসাইডের বিপরীতে ২০০ লিটার কেনা হয়েছে। ৭২টি ফগার মেশিনের বিপরীতে ২৪টি মেশিন কিনে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

‘নগরীর শ্যামাসুন্দরী খাল দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধারসহ সংস্কারে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে’, সংযোজন করেন তিনি।


    শেয়ার করুন: