চায়ের দোকান চালিয়েও পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন নন্দিতার

ছবি: আগামীর সময়
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার এক ছোট্ট গ্রাম ‘কলিগ্রাম’। সেখানেই দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে আছে ১৭ বছর বয়সী নন্দিতা বিশ্বাস। বয়সটা যেখানে স্বপ্ন দেখার, আনন্দে ভেসে থাকার সেখানে নন্দিতার দিন কাটে সংসারের হিসাব কষে। চায়ের কাপ ধুয়ে, দোকানের কাজ সামলে বাস্তবতার কঠিন চাপের মধ্যেই তার প্রতিটি মুহূর্ত গড়ে ওঠে। তবু থেমে যায়নি তার স্বপ্ন। সব ক্লান্তি আর অভাবের ভেতরেও বইয়ের পাতা উল্টে সে এগিয়ে চলেছে নিজের লক্ষ্যের দিকে। একদিন পুলিশ হয়ে দেশের সেবা করবে, এই অদম্য বিশ্বাস বুকে নিয়েই।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে কঠিন বাস্তবতা। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে মায়ের কাঁধের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয় সে। মা উন্নতি বিশ্বাস কলিগ্রাম মোড়ে মাসে মাত্র ৪০০ টাকা ভাড়ায় একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে চায়ের দোকান চালান। সেই দোকানই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আর সেই দোকানেরই এক কোণে বসে, ফাঁকে ফাঁকে বই খুলে পড়ে নন্দিতা। স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম।
চা বানানো, ক্রেতাদের ডাক, কাপ ধোয়া সব কাজের ফাঁকেও তার চোখ থাকে বইয়ের পাতায়। কারণ সে জানে, এই বই-ই পারে তাকে দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যেতে। জলিরপাড় জে কে এম বি মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে নন্দিতা। কিন্তু তার এই পথচলা মোটেও সহজ নয়।
একই পরিবারের ছোট বোন নবম শ্রেণিতে এবং ভাই অষ্টম শ্রেণিতে পড়লেও অর্থাভাবে তাদের পড়াশোনা এখন প্রায় বন্ধের পথে। ঠিকমতো দুবেলা খাবার জোটানোই যেখানে কঠিন, সেখানে পড়াশোনা চালানো যেন বিলাসিতা। বাধ্য হয়ে মা দুই সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি নন্দিতাকেও পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বলেছেন তিনি। কিন্তু নন্দিতা হার মানেনি, স্বপ্নের কাছে সে এখনও অবিচল।
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, ‘ছোটবেলা থেকেই পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখি। দেশের জন্য কিছু করতে চাই, পরিবারের দায়িত্ব নিতে চাই। অনেক কষ্ট হয়, তবু পড়াশোনা ছাড়তে চাই না।’
অন্যদিকে মায়ের চোখে অসহায়ত্ব। উন্নতি বিশ্বাস বলেছেন, ‘বিধবা ভাতা আর চা বিক্রির টাকায় কোনোমতে সংসার চলে। তিনজনের পড়াশোনার খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই দুইজনকে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বড় মেয়েকেও বলেছি, কিন্তু সে শোনে না। যদি কোনো সহযোগিতা পেতাম, তাহলে হয়তো ওদের পড়াশোনা চালাতে পারতাম।’
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এত সংগ্রামের পরও এখনও কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি। বিদ্যালয়ে দরিদ্র মেধাবীদের জন্য উপবৃত্তি থাকলেও সেই সুযোগও পায়নি এই পরিবার।
তবুও নন্দিতা থেমে নেই। চায়ের দোকানের ধোঁয়ার ভেতর দিয়েই সে তার স্বপ্নকে স্পষ্ট করে দেখতে পায়। হয়তো পথটা কঠিন, হয়তো চারপাশে অন্ধকার কিন্তু তার ভেতরের আলো এখনও নিভে যায়নি।



