ঝিনাইদহে চাষির মাথায় হাত
পেঁয়াজের বাম্পার ফলনেও কাঁদছেন কৃষক
- এবার ১৩ হাজার ৪৬৪ হেক্টর জমিতে আবাদ
- বিঘায় খরচ ৫০-৬০ হাজার টাকা
- লোকসান ২০-২৫ হাজার টাকা
- উৎপাদনের লক্ষ্য সোয়া ২ লাখ টন
- ফলেছে আড়াই লাখ টনের বেশি
- সংরক্ষণাগারের অভাবে লোকসান

ছবি: আগামীর সময়
ঝিনাইদহের স্বপ্নবাজ কৃষক মোক্তার হোসেন। নেই নিজের কোনো জমিজমা। স্ত্রী, মা ও দুই সন্তান নিয়ে সংসার। অন্যের ভূমি লিজ (চুক্তি) নিয়ে ঘোরাচ্ছেন জীবনের চাকা। পাঁচ সদস্যের পরিবারে একটু সচ্ছলতা আনতে দুই বিঘা জমিতে ফলিয়েছেন পেঁয়াজ। অঙ্কুরিত থেকে পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত চোখ জুড়িয়েছে ফসলের সবুজ মাঠ। কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন দেখে লাভের আশায় বাঁধেন বুক। শস্য ঘরে আনার পর একই নয়নে ঝরছে অশ্রু। দাম না পেয়ে পথে বসতে হচ্ছে তাকে।
চলতি মৌসুমে ২০০ মণ পেঁয়াজ ঘরে তোলেন শৈলকুপার ফলিয়া গ্রামের এই কৃষক। তার জমিতে বীজ, সার, শ্রমিক, সেচসহ খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সুখ সাগর জাতের পেঁয়াজের চাষে ফলনও হয়েছে বাম্পার, বিঘাপ্রতি প্রায় ১০০ মণ। ৫০০ টাকা মণ হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে অন্তত ৫০ হাজার টাকা— দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালেন মোক্তার।
বাজারের অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেই মুখ কালো হয়ে গেল মোক্তারসহ উপস্থিত আরও কয়েক কৃষকের। বললেন, দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ঝিনাইদহ। এখানে প্রতিবছর হাজার মণ ফলন হলেও লাভ হয় না কৃষকের। কষ্ট করে পেঁয়াজ চাষ করেও গুনতে হয় লোকসান। অথচ কয়েক মাস পরেই একই শস্য প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। জেলায় সরকারি সংরক্ষণাগার না থাকায় নিয়মিত এ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে চাষিদের।
এ বছর ঝিনাইদহে ১৩ হাজার ৪৬৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে পেঁয়াজ। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৩৫ হাজার টন হলেও ফলেছে ২ লাখ ৬৩ হাজার টন— বলছে কৃষি বিভাগ।
মোক্তারের মতো জেলার শৈলকুপাসহ বিভিন্ন উপজেলার শত শত কৃষকের জমিতে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দাম কম। আবার ঘরে রাখাও সম্ভব নয় কাঁচা এ শস্য। এতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক।
ভাটই গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম জানালেন, জমিতে পেঁয়াজ চাষে বিঘায় খরচ হয় ৫০-৬০ হাজার টাকা। এ ব্যয় তুলতে মূল্য হতে হবে মণপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু বাজারে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ কৃষক।
নিরুপায় হওয়ার কথা জানালেন ব্যবসায়ী ও আড়তদার মাসুদুজ্জামান লিটন ও ইমরান হোসেন। তাদের ভাষ্য, পেঁয়াজ আবাদ করেন এ জেলায় শত শত কৃষক। একসঙ্গে বাজারে প্রচুর ফসল আসে, চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় মেলে না দাম। বেশি দরে কিনলে ব্যবসায়ীদেরও গুনতে হবে লোকসান— বাজারের চিত্র তুলে ধরলেন তারা।
সরকারি প্রণোদনা বাড়ানোর তাগিদ দিলেন জেলা কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আনিসুজ্জামান। বললেন, জেলায় এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে পেঁয়াজের। তবে আমদানি বেশি হওয়ায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। সংরক্ষণাগারও নেই। সেটি স্থাপন করা গেলে লাভবান হবেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা।
বাজারে দাম কম হলেও খরচ তুলতে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। তাদের কথা বিবেচনায় সংরক্ষণাগার বসানো হবে বলে আশ্বস্ত করলেন জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন।






