খয়েরিমাথা শুমচা, একই অঙ্গে নানা রঙ

সুদর্শন পাখি খয়েরিমাথা শুমচা। ছবি: তুহিন ওয়াদুদ
সুদর্শন পাখি খয়েরিমাথা শুমচা। গোটা শরীরজুড়ে যার রঙয়ের বাহার। এটি মূলত গ্রীষ্মের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। পরিচিত হালতি নামেও। বাংলাদেশে কয়েক ধরনের শুমচা পাখি দেখা যায়। তার মধ্যে এ পাখিটি অন্যতম। পাখিটি আমাদের দেশে সর্বত্র দেখা দেখা না গেলেও খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলে কিছু কিছু স্থানে দেখা মেলে।
চট্টগ্রামের হাজারিখিল বনেও পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঘন গাছগাালি সমৃদ্ধ এলাকায় প্রজননকালে দেখা যায় পাখিটি।
খুলনার রূপসা উপজেলার একটি গ্রাম থেকে সম্প্রতি খয়েরিমাথা শুমচার ছবিটি তুলেছেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও সৌখিন আলোকচিত্রী ড. তুহিন ওয়াদুদ। তিনি জানান, ওই গ্রামে গাছ-গাছালি অনেক ঘন। ঝোপ-জঙ্গলও আছে। খবারের জন্য মাটিতে নেমে আসে পাখিটি। গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালের কিছুদিন বাংলাদেশে থাকে এটি। তবে এর সংখ্যা অনেক কমে গেছে আগের থেকে।
দেখতে খুবই দৃষ্টিনন্দন। এই পাখির শরীরে রয়েছে নানান রঙের সমাহার। লাল, কালো, খয়েরি, নীল, সবুজ, সাদা— যেন একই অঙ্গে অনেক রঙ। এ পাখিরা যখন আকাশে উড়ে বেড়ায় তখন মনে হয় চারদিকে রংধনুর সাতরঙ ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রীষ্মকালে এরা আমাদের দেশে মাত্র কয়েক মাসের জন্য অতিথি হয়ে আসে। বর্ষাকাল কাটিয়ে আবার চলে যায় অন্য কোনো বর্ষা প্রবণ অঞ্চলে। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে আমাদের দেশে আসে এরা। এ সময়টা তাদের প্রজনন কাল। এরা খুব লাজুক ও নিভৃতচারী। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই নিজেকে পাতার ফাঁকে কিংবা ডালে আড়াল করে নেয়। যার কারণে এদের খুব একটা দেখা যায় না। পিট্টিডি পরিবারভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম পিট্টা ম্যাগারিনকা।
স্বনামধন্য পাখি গবেষক শরীফ খান এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘তার শরীরে আছে মোট ১৭ টি রঙের আশ্চর্য-সুন্দর শৈল্পিক কারুকাজ। উড়লে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে রংধনুর সাতটি রঙের ঝলমলে আভা।’
লাজুক ও নিভৃতচারী পাখিটি মানুষসহ অপ্রত্যাশিত কোনো কিছুর উপস্থিতি সহ্য করতে পারে না। মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যায় পাতার ফাঁকে কিংবা ডালের আড়ালে। এ কারণেই হয়তো অনেকেরই দেখা হয়নি এই অপূর্ব সুন্দর পরিযায়ী পাখিটি। কিছুটা সময় এরা আমাদের দেশে কাটিয়ে ডানায় ভর করে আবার ফিরে যায় অন্য কোনো দেশের নিভৃত স্থানে।
খয়েরিমাথা শুমচা শালিকের চেয়ে ছোট। এরা লম্বায় ১৯ সেন্টিমিটার, ওজন ৬৫ গ্রাম। এদের দেহ সবুজ। মাথার চাঁদি খয়েরি। ঘাড় কালচে খয়েরি। গলা ও গাল কালো। চোখ কালচে বাদামি, ঠোঁট কালো। ডানা উজ্জ্বল নীল। পা কালচে। শুমচার বাচ্চাদের রঙ অনেকটা বির্বণ। পেট বাদামি। চোখের রঙ বাদামি। সাধারণত চিরসবুজ বনের তলদেশে পোকামাকড় খুঁজে বেড়ায়। এরা বনের মধ্যে বাসা বাঁধে। সাদা রঙের সর্বোচ্চ দুই থেকে পাঁচটি ডিম দেয়। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর এদের প্রজননকাল। মেয়ে-ছেলে উভয় পাখি পালা করে ডিমে তা দেয়। বাচ্চারা উড়তে শেখার পর শুমচারা এখানে স্থায়ী আবাস গড়ে না। অন্যত্র চলে যায়।
খয়েরিমাথা শুমচা মাটি থেকে আড়াই-তিন ফুটের মধ্যেই বিচরণ করে। বেশি ওপরে উড়াউড়ি করেনা। ভেজা মাটি বা ভেজা বনতল এদের প্রিয় আবাস। এরা দেড় থেকে দুইশ’ বর্গমিটার এলাকায় বিচরণ করে। তবে ওই এলাকা অবশ্যই এদের খাদ্যে পরিপূর্ণ থাকতে হবে। প্রজনন মৌসুমের সময় নির্দিষ্ট এলাকা ছেড়ে এরা কোথাও যায় না।
এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে কেঁচোসহ নানাজাতের কীটপতঙ্গ। এরা অন্য পরিযায়ীদের সঙ্গে মেশেনা। আলাদা ঘুরে বেড়ায়। ২০০৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ’ বইয়ে শুমচা পাখিকে বাংলাদেশে দুর্লভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা (আইইউসিএন) এটিকে সারা বিশ্বে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে শুমচা প্রজাতিটি সংরক্ষিত।
অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের ভাষ্য, ‘যতদূর জেনেছি চিরসবুজ বনে বিচরণ করা খয়েরিমাথা শুমচা আমাদের দেশে গ্রীষ্মের পরিযায়ী পাখি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে এদের দেখা যায়। বর্ষা শেষে আবার চলে যায়। অপরুপ সুন্দর এই পাখিকে প্রকৃতিতে টিকিয়ে রাখতে হলে আগে এদের আবাসস্থল টিকিয়ে রাখা জরুরি।’



