কক্সবাজার
সংকটেও বিদ্যুৎ গিলছে টমটম-ইজিবাইক
- লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন
- পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব
- কৃষিতে জ্বালানি সংকটের তীব্রতা
- ক্ষুদ্র শিল্পে ধসের আশঙ্কা
- বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা

ছবি: আগামীর সময়
বৈশাখের দাবদাহে উত্তপ্ত দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার। পরিস্থিতি আরও অসহনীয় করে তুলেছে চলমান বিদ্যুৎ সংকট। দিন হোক বা রাত, দীর্ঘ সময় ধরে চলে লোডশেডিং। কারণ, জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ ও উৎপাদন ঘাটতি। গ্রাম বা শহর, কেউই রেহাই পায়নি এ বিপর্যয় থেকে।
এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় শহরের হাজার হাজার টমটম ও ইজিবাইক। এ ধরনের বাহনের নেই কোনো অনুমতি। আবার ব্যাটারি চার্জ করতে প্রতিদিনই লাগছে ৮ থেকে ৯ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ।
চাহিদা-সরবরাহে বড় ফারাক
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কক্সবাজার জানাচ্ছে, জেলা সদরে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩০ থেকে ৩২ মেগাওয়াট। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় গ্রামীণ এলাকায় চাহিদা প্রায় ১৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১০০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে জেলায় মোট চাহিদা প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট হলেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বড় একটি অংশ।
পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি জানাচ্ছিলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ। পাশাপাশি আবহাওয়ার কারণে খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্টের উৎপাদন থেকে আসছে না স্থিতিশীল সরবরাহ।’
লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। শহর এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ থাকছে না ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত। উপজেলাগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিং চলে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত। এতে বিপাকে পড়েছে প্রায় ২৮ লাখ স্থানীয় মানুষ ও ১৫ লাখ রোহিঙ্গা।
শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকার গৃহিণী আসমা বেগম জানাচ্ছিলেন, দিন হোক বা রাত, গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া থাকা মুশকিল। ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ফ্রিজ-টিভিও নষ্টের পথে।
লিংক রোডের বাসিন্দা আকবরের অভিযোগ, ‘বিদ্যুৎ বিতরণে আছে বৈষম্য। কোথাও অবৈধভাবে চলছে দ্বৈত সংযোগ, এ কারণে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ।’
সংকটের মধ্যে বাড়তি চাপ টমটম-ইজিবাইক
পিডিবি জানাচ্ছে, প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জ দিতে ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে শহরের প্রায় ২৩ হাজার টমটম ও ইজিবাইক। অথচ এসব বাহনের অনুমোদিত সংখ্যা এক-চতুর্থাংশেরও কম।
শহরের ঝাউতলা, কলাতলী, বাস টার্মিনাল, সমিতিপাড়া, বৈদ্যঘোনা, পাহাড়তলীসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ৩৫০টি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসবের বড় একটি অংশ ব্যবহার করছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কক্সবাজারের ৯টি উপজেলায় রয়েছে প্রায় এক লাখের বেশি টমটম ও ইজিবাইক। এগুলোর দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ কিলোওয়াট। এ বাহনগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থাই শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর তৈরি করছে অতিরিক্ত চাপ।
পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে পর্যটন শিল্পেও। কক্সবাজারের হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউসে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পর্যটকরা। বুকিং বাতিল করে ফিরে যাচ্ছেন অনেকেই।
হোটেল ব্যবসায়ী মুকিম খান জানাচ্ছিলেন, দিনে ও রাতে বিদ্যুৎ যায় তিন থেকে পাঁচবার। পাওয়া যাচ্ছে না জেনারেটর চালানোর ডিজেলও। কঠিন হয়ে পড়েছে ব্যবসা চালানো।
হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি হাজি আবুল কাশেম সিকদারের ভাষ্য, ‘একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেশি। পুরো পর্যটন খাত রয়েছে বড় সংকটে।’
কৃষিতে জ্বালানি সংকটের তীব্রতা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক তপন কুমার রায় জানাচ্ছিলেন, বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের ঘাটতি। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে জেলার ৭ হাজার ১৪৬টি সেচ পাম্পের মধ্যে ৪ হাজার ২০০টির বেশি। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান উৎপাদন। ‘এই সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্য উৎপাদনেও পড়বে বড় প্রভাব।’
একই হতাশা চকরিয়া উপজেলার খুঁটাখালী ইউনিয়নের কৃষক সাঈদুল ইসলামের কণ্ঠে, ‘এক মাস ধরে চালাতে পারছি না পাম্প। এভাবে চললে শেষ মুহূর্তে এসে বাঁচানো যাবে না ধানগাছ।’
ক্ষুদ্র শিল্পে ধসের আশঙ্কা
লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে বরফকল, চিংড়ি হ্যাচারি, পোলট্রি খামারসহ হাজারো ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। কক্সবাজার পোলট্রি ফার্ম মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সালামের ভাষ্য, দুই হাজারের বেশি খামার রয়েছে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে। এতে কর্মসংস্থান হারাতে পারে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ।
উৎপাদন ঘাটতির পেছনের কারণ
কয়লা সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বর্তমানে এর উৎপাদন নেমে এসেছে ৩০০ মেগাওয়াটে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিড থেকেও মিলছে না পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ। নবায়নযোগ্য উৎস হিসেবে খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকেও উৎপাদন অনিয়মিত, কারণ এটি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কয়লা আমদানি হলে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারবে মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অন্ধকার থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা। নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
তবে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদারের দাবি, চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে এরই মধ্যে বাড়তি টহল শুরু করেছে পুলিশ।
সামাজিক সংগঠনের ক্ষোভ
সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যানজট সংকটে কক্সবাজার জর্জরিত। দ্রুত সমাধান না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও জনজীবনে।’
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার আক্ষেপ, কক্সবাজারে বিদ্যুৎ সংকট এখন অবকাঠামোগত সমস্যা নয়। জনজীবন, কৃষি, শিল্প ও পর্যটন ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে এটি। তার দাবি, অনিয়ন্ত্রিত টমটম-ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতিকে করে তুলেছে আরও জটিল।
তবে জেলা প্রশাসক আ. মান্নান জানাচ্ছিলেন, জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক সমস্যা। সাশ্রয়ীভাবে মোকাবিলায় সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। পাশাপাশি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে অবৈধ বৈদ্যুতিক বাহন নিয়ন্ত্রণের।’
এদিকে বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছিলেন, ‘উৎপাদন বাড়ানো, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়ানো, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং টমটম-ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং বন্ধ —এসব না হলে শিগগির সংকট সমাধান সম্ভব নয়।’



