বিপাকে কৃষক
‘বাজারে দাম নাই, আলু রাহারও জাগা নাই’

আলু তুলে ক্ষেতের পাশেই স্তূপ করে রেখেছেন কৃষক জামাল মীর। ছবি : আগামীর সময়
নিজের কোনো জমি নেই পটুয়াখালীর গলাচিপার কৃষক জামাল মীরের। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন নানা ধরণের মৌসুমি ফসল। এ বছরও আমন ধান বিক্রির জমানো পঞ্চাশ হাজার টাকায় বর্গা নেন ১২৫ শতাংশ জমি। ভালো দামের আশায় সেই জমিতে চাষ করেছিলেন আলু। হয়েছে বাম্পার ফলন। তবুও আলু তোলার পর যে দাম পাচ্ছেন তাতে লাভ তো দূরে থাক খরচের টাকা তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
উপজেলার আব্দুল্লাপুর গ্রামের এই চাষি বলেছেন, বর্গা নেওয়া ১২৫ শতক জমিতে আলু চাষ করতে কিটনাশক ও শ্রমিকের মুজুরি মিলিয়ে খরচ করেছেন প্রায় ২ লাখ টাকা। ফলন ভালো হলেও বাজার পড়ে যাওয়ায় বিক্রিও করতে পারছেন না। তাই বাধ্য হয়ে আলু তুলে স্তূপ করে রেখেছেন খেতের পাশে। হিমাগার স্বল্পতায় পারছেন না আলু সংরক্ষণ করতেও। কীভাবে পরের মৌসুমে ফসল চাষ করবেন তা নিয়েও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।
শুধু জামাল মীরই নন। আলু চাষ করে একই ধরনের বিপাকে পড়েছেন উপজেলার অন্য আলু চাষিীরাও।
আলুচাষি আইয়ুব হাওলাদার বলেছেন, প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকায়। বিঘা প্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা।
একই কথা বলেছেন রেজাউল মাতুব্বরও। তিনি বলেন, বীজ, সার, শ্রমিকসহ সব খরচ মিটিয়ে আলু বিক্রি করে হাতে কিছুই থাকছে না বলে জানান।
স্থানীয় কৃষক আম্বিয়া আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত খাটুনি দেই, করি দুইডা টাহার জন্য। বাজারে দাম নাই আলু রাহার জাগাও নাই। তাই মাঠেই কুডা দিয়া ঢাইকা রাহি। বৃষ্টি আইলেই সব নষ্ট হয়ে যায়। যদি হিমাগার থাকতো, হ্যারে মোরা কিছু দাম পাইতাম।’
তিন বছর আগেও পটুয়াখালী ছিল বরিশাল বিভাগের শীর্ষ আলু উৎপাদনকারী জেলা। কিন্তু সংরক্ষণ সংকট ও বাজারমূল্যের অস্থিরতায় আজ সেই জেলায় আবাদ কমেছে অর্ধেকেরও বেশি।
গলাচিপা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে এখানে প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬০ হেক্টরে। ২০২৬ সালে ঘটে আরও বড় পতন। চাষ নেমে আসে মাত্র ২৬০ হেক্টরে। একই চিত্র পুরো জেলাতেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬১৩ হেক্টরে।
এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও। গলাচিপা উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. আকরামুজ্জামান জানান, প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২৫ টন আলু উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে তা ধরে রাখতে পারছেন না কৃষকেরা। ফলে মৌসুমে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং বছর বছর পড়ছেন লোকসানে।
মো. আকরামুজ্জামান আরও জানান, চলতি বছর ৩৬৫ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা অর্জন সম্ভব হয়নি কৃষকদের অনাগ্রহে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা না হলে আগামীতে আবাদ আরও কমে যাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমানুল ইসলাম মনে করেন, এ অঞ্চলে আলু উৎপাদনের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে ব্যবস্থা নেই বিকল্প হিমাগারের। তিনি জানান, চলতি বছর ১৭০ জন কৃষককে বীজ, সার ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে বিএডিসির মাধ্যমে। উৎপাদিত আলুর একটি অংশ বরিশালের হিমাগারে সংরক্ষণ করা গেলেও অধিকাংশই স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, আলোচনা চলছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই গলাচিপায় একটি হিমাগার স্থাপনে নেওয়া হবে কার্যকর পদক্ষেপ।





